মদনুগ্রহায় পরমং গুহ্যমধ্যাত্মসংজ্ঞিতম্।
যৎ ত্বয়োক্তং বচস্তেন মোহোহয়ং বিগতো মম।।১
অনুবাদ
অর্জুন কহিলেন — আমার প্রতি তুমি অনুগ্রহ করিয়া যে পরম গুহ্য অধ্যাত্মতত্ত্ব বর্ণনা করিলে, তাহাতে আমার এই মোহ বিদূরিত হইল।
ভবাপ্যয়ৌ হি ভূতানাং শ্রুতৌ বিস্তরশো ময়া।
ত্বত্তঃ কমলপত্রাক্ষ মাহাত্ম্যমপি চাব্যয়ম্।।২
অনুবাদ
হে কমললোচন, ভূতগণের উৎপত্তি ও লয় এবং তোমার অক্ষয় মাহাত্ম্য — এ সকলই তোমার নিকট হইতে সবিস্তারে আমি শুনিলাম।
এবমেতদ্ যথাত্থ ত্বমাত্মানং পরমেশ্বর।
দ্রষ্টুমিচ্ছামি তে রূপমৈশ্বরং পুরুষোত্তম।।৩
অনুবাদ
হে পরমেশ্বর, আপনার বিষয়ে তুমি যাহা বলিলে তাহা ঐরূপই। হে পুরুষোত্তম, তোমার ঐশ্বরিক রূপ দেখিতে ইচ্ছা করি আমি।
মন্যসে যদি তচ্ছক্যং ময়া দ্রষ্টুমিতি প্রভো।
যোগেশ্বর ততো মে ত্বং দর্শয়াত্মানমব্যয়ম্।।৪
অনুবাদ
হে প্রভো, সেই রূপ দর্শনের যোগ্য আমি যদি তুমি মনে কর — তাহা হইলে হে যোগেশ্বর, তোমার সেই অক্ষর আত্মরূপ প্রদর্শন করাও আমায়।
পশ্য মে পার্থ রূপাণি শতশোহথ সহস্রশঃ।
নানাবিধানি দিব্যানি নানাবর্ণাকৃতীনি চ।।৫
অনুবাদ
শ্রীভগবান কহিলেন — হে পার্থ, নানা বর্ণ ও নানা আকৃতিবিশিষ্ট শত শত, সহস্র সহস্র বিভিন্ন অবয়ববিশিষ্ট আমার এই অদ্ভুত রূপ দর্শন করো।
পশ্যাদিত্যান্ বসূন্ রুদ্রানশ্বিনৌ মরুতস্তথা।
বহুন্যদৃষ্টপূর্বাণি পশ্যাশ্চর্যাণি ভারত।।৬
অনুবাদ
হে ভারত, আমার দেহে দ্বাদশ আদিত্য, অষ্ট বসু, একাদশ রুদ্র, অশ্বিনীকুমারদ্বয় এবং উনপঞ্চাশ মরুদ্গণ দর্শন করো। পূর্বে কখনও দেখ নাই যাহা — বহুবিধ তেমন আশ্চর্য বস্তু দর্শন করো।
ইহৈকস্থং জগৎ কৃৎস্নং পশ্যাদ্য সচরাচরম্।
মম দেহে গুড়াকেশ যচ্চান্যদ্ দ্রষ্টুমিচ্ছসি।।৭
অনুবাদ
হে নিদ্রাজয়ী অর্জুন, আমার এই দেহে একত্রে অবস্থিত চরাচর সমগ্র জগৎ তুমি দর্শন করো এবং অপর যাহা কিছু দেখিতে ইচ্ছা করো তাহাও এখন দেখিয়া নাও।
ন তু মাং শক্যসে দ্রষ্টুমনেনৈব স্বচক্ষুষা।
দিব্যং দদামি তে চক্ষুঃ পশ্য মে যোগমৈশ্বরম্।।৮
অনুবাদ
এই চর্মচক্ষু দ্বারা তুমি আমার এই রূপ দর্শনে সমর্থ হইবে না। দিব্যচক্ষু দিতেছি এজন্য তোমাকে। তদ্বারা আমার এই ঐশ্বরিক যোগসামর্থ্য দেখো।
এবমুত্ত্বা ততো রাজন্ মহাযোগেশ্বরো হরিঃ।
দর্শয়ামাস পার্থায় পরমং রূপমৈশ্বরম্।।৯
অনুবাদ
সঞ্জয় বলিলেন — হে রাজন, এইরূপ বলিয়া মহাযোগেশ্বর হরি পার্থকে পরম ঐশ্বরিক রূপ দেখাইলেন।
অনেকবক্ত্রনয়নমনেকাদ্ভুতদর্শনম্।
অনেকদিব্যাভরণং দিব্যানেকোদ্যতায়ুধম্।।১০
অনুবাদ
অসংখ্য মুখ ও নেত্র, অসংখ্য অদ্ভুত দর্শনীয় বস্তু, অসংখ্য দিব্য আভরণ এবং অসংখ্য উদ্যত দিব্যাস্ত্র সেই ঐশ্বরিক রূপে বিদ্যমান।
দিব্যমাল্যাম্বরধরং দিব্যগন্ধানুলেপনম্।
সর্বাশ্চর্যময়ং দেবমনন্তং বিশ্বতোমুখম্।।১১
অনুবাদ
সেই বিশ্বরূপ দিব্য মাল্য ও বস্ত্রে সুশোভিত, দিব্য গন্ধদ্রব্যে অনুলিপ্ত, সর্বাশ্চর্যময় দ্যুতিমান, অনন্ত ও সর্বতোমুখ।
দিবি সূর্যসহস্রস্য ভবেদ্ যুগপদুত্থিতা।
যদি ভাঃ সদৃশী সা স্যাদ্ ভাসস্তস্য মহাত্মনঃ।।১২
অনুবাদ
যুগপৎ সহস্র সূর্যের প্রভা যদি আকাশে উত্থিত হয় — তাহা হইলে সেই সূর্যের সহস্র প্রভা মহাত্মা বিশ্বরূপের প্রভার তুল্য হইতে পারে।
তত্রৈকস্থং জগৎ কৃৎস্নং প্রবিভক্তমনেকধা।
অপশ্যদ্দেবদেবস্য শরীরে পাণ্ডবস্তদা।।১৩
অনুবাদ
অর্জুন সেই দেবদেবের দেহে তখন নানা ভাগে বিভক্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গস্বরূপ একত্রস্থিত সমস্ত জগৎ দেখিয়াছিলেন।
ততঃ স বিস্ময়াবিষ্টো হৃষ্টরোমা ধনঞ্জয়ঃ।
প্রণম্য শিরসা দেবং কৃতাঞ্জলিরভাষত।।১৪
অনুবাদ
ধনঞ্জয় সেই বিশ্বরূপ দর্শন করিয়া বিস্ময়ে আপ্লুত হইলেন। রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল তাঁহার সর্বাঙ্গ। অবনতমস্তকে তিনি সেই দেবকে প্রণাম করিয়া করজোড়ে বলিতে লাগিলেন।
পশ্যামি দেবাংস্তব দেব দেহে সর্বাংস্তথা ভূতবিশেষসঙ্ঘান্।
ব্রহ্মাণমীশং কমলাসনস্থমৃষীংশ্চ সর্বানুরগাংশ্চ দিব্যান্।।১৫
অনুবাদ
অর্জুন কহিলেন — হে দেব, সমস্ত দেবগণ, বিবিধ সৃষ্টপদার্থ, কমলাসনে ব্রহ্মা, নারদ-সনকাদি দিব্য ঋষিগণ এবং অনন্ত তক্ষকাদি সর্পগণকে তোমার দেহে দেখিতেছি।
অনেকবাহূদরবক্ত্রনেত্রং পশ্যামি ত্বাং সর্বতোহনন্তরূপম্।
নান্তং ন মধ্যং ন পুনস্তবাদিং পশ্যামি বিশ্বেশ্বর বিশ্বরূপ।।১৬
অনুবাদ
উদর, বদন, অসংখ্য বাহু ও নেত্রবিশিষ্ট অনন্তরূপ তোমাকে সকল দিকেই দেখিতেছি আমি। কিন্তু হে বিশ্বেশ্বর, হে বিশ্বরূপ, তোমার আদি, অন্ত, মধ্য কোথাও কিছু দেখিতেছি না।
কিরীটিনং গদিনং চক্রিণঞ্চ তেজোরাশিং সর্বতো দীপ্তিমন্তম্।
পশ্যামি ত্বাং দুর্নিরীক্ষ্যং সমন্তাদ্ দীপ্তানলার্কদ্যুতিমপ্রমেয়ম্।।১৭
অনুবাদ
গদা ও চক্রধারী, কিরীটশোভিত, দীপ্তিশালী সর্বত্র, তেজঃপুঞ্জস্বরূপ, প্রদীপ্ত অগ্নি ও সূর্যের ন্যায় প্রভাসম্পন্ন, দুর্নিরীক্ষ্য, অপরিমেয় তোমার অদ্ভুত মূর্তি সর্বদিকে সর্বস্থানে আমি দেখিতেছি।
ত্বমক্ষরং পরমং বেদিতব্যং ত্বমস্য বিশ্বস্য পরং নিধানম্।
ত্বমব্যয়ঃ শাশ্বতধর্মগোপ্তা সনাতনস্ত্বং পুরুষো মতো মে।।১৮
অনুবাদ
অক্ষর পরব্রহ্ম তুমি, জ্ঞাতব্য তত্ত্ব তুমিই একমাত্র। বিশ্বের পরম আশ্রয় তুমিই। সনাতন ধর্মের প্রতিপালক তুমিই। অব্যয় সনাতন পুরুষ তুমি — আমার সংশয় নাই ইহাতে।
অনাদিমধ্যান্তমনন্তবীর্যমনন্তবাহুং শশিসূর্যনেত্রম্।
পশ্যামি ত্বাং দীপ্তহুতাশবক্ত্রং স্বতেজসা বিশ্বমিদং তপন্তম্।।১৯
অনুবাদ
আদি, অন্ত, মধ্য নাই তোমার। বলৈশ্বর্যের অবধি নাই। অসংখ্য বাহু, চন্দ্রসূর্য তোমার নেত্রস্বরূপ। প্রদীপ্ত হুতাশন জ্বলিতেছে তোমার মুখমণ্ডলে। তুমি স্বীয় তেজে নিখিল বিশ্বকে সন্তাপিত করিতেছ।
দ্যাবাপৃথিব্যোরিদমন্তরং হি ব্যাপ্তং ত্বয়ৈকেন দিশশ্চ সর্বাঃ।
দৃষ্ট্বাদ্ভুতং রূপমুগ্রং তবেদং লোকত্রয়ং প্রব্যথিতং মহাত্মন্।।২০
অনুবাদ
হে মহাত্মন্, তুমিই একমাত্র স্বর্গ ও পৃথিবীর মধ্যস্থল এই অন্তরীক্ষ এবং দিক্সকলও ব্যাপিয়া রহিয়াছ। এই অদ্ভুত উগ্রমূর্তি দর্শন করিয়া ত্রিলোক ব্যথিত হইতেছে।
অমী হি ত্বাং সুরসঙ্ঘা বিশন্তি কেচিদ্ভীতাঃ প্রাঞ্জলয়ো গৃণন্তি।
স্বস্তীত্যুক্ত্বা মহর্ষিসিদ্ধসঙ্ঘাঃ স্তবন্তি ত্বাং স্তুতিভিঃ পুষ্কলাভিঃ।।২১
অনুবাদ
তোমাতে প্রবেশ করিতেছেন ঐ দেবতাগণ। ভীত হইয়া কেহ কেহ কৃতাঞ্জলিপূর্বে রক্ষা প্রার্থনা করিতেছেন। স্বস্তি স্বস্তি বলিয়া মহর্ষি ও সিদ্ধগণ উত্তম সারগর্ভ স্তোত্রসমূহদ্বারা তোমার স্তব করিতেছেন।
রুদ্রাদিত্যা বসবো যে চ সাধ্যা বিশ্বেহশ্বিনৌ মরুতশ্চোষ্মপাশ্চ।
গন্ধর্বযক্ষাসুরসিদ্ধসঙ্ঘা বীক্ষন্তে ত্বাং বিস্মিতাশ্চৈব সর্বে।।২২
অনুবাদ
একাদশ রুদ্র, দ্বাদশ আদিত্য, অষ্ট বসু, সাধ্য নামক দেবগণ, বিশ্বদেবগণ, অশ্বিনীকুমারদ্বয়, উনপঞ্চাশ মরুৎ, উষ্মপা, গন্ধর্ব, যক্ষ, অসুর ও সিদ্ধগণ — সকলেই বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া তোমায় দর্শন করিতেছেন।
রূপং মহৎ তে বহুবক্ত্রনেত্রং মহাবাহো বহুবাহূরুপাদম্।
বহুদরং বহুদংষ্ট্রাকরালং দৃষ্ট্বা লোকাঃ প্রব্যথিতাস্তথাহম্।।২৩
অনুবাদ
হে মহাবাহো, অনেক মুখ, নেত্র, বাহু, উরু, পদ ও উদরবিশিষ্ট এবং বহু বৃহদাকার দন্তদ্বারা ভয়ঙ্করদর্শন তোমার এই সুবিশাল মূর্তি দেখিয়া লোকসকল ভীত হইয়াছে এবং আমিও ভীত হইয়াছি।
নভঃস্পৃশং দীপ্তমনেকবর্ণং ব্যাত্তাননং দীপ্তবিশালনেত্রম্।
দৃষ্ট্বা হি ত্বাং প্রব্যথিতান্তরাত্মা ধৃতিং ন বিন্দামি শমং চ বিষ্ণো।।২৪
অনুবাদ
হে বিষ্ণো, নভস্পর্শী তেজোময়, বিচিত্রবর্ণ, বিস্ফারিত বদন, অত্যুজ্জ্বল বিশাল নেত্রবিশিষ্ট তোমার রূপ দেখিয়া আমার অন্তরাত্মা ব্যথিত হইতেছে। দেহেন্দ্রিয় আমার বিকল হইতেছে, শান্ত করিতে পারিতেছি না আমি মনকে।
দংষ্ট্রাকরালানি চ তে মুখানি দৃষ্ট্বৈব কালানলসন্নিভানি।
দিশো ন জানে ন লভে চ শর্ম প্রসীদ দেবেশ জগন্নিবাস।।২৫
অনুবাদ
ভয়ানকদর্শন বৃহৎ দন্তসমূহের দ্বারা প্রলয়াগ্নিসদৃশ তোমার মুখসকল দর্শন করিয়া আমার দৃষ্টিভ্রম ঘটিতেছে, আমি স্বস্তি পাইতেছি না। প্রসন্ন হও হে দেবেশ, হে জগন্নিবাস।
অমী চ ত্বাং ধৃতরাষ্ট্রস্য পুত্রাঃ সর্বে সহৈবাবনিপালসঙ্ঘৈঃ।
ভীষ্মো দ্রোণঃ সূতপুত্রস্তথাহসৌ সহাস্মদীয়ৈরপি যোধমুখ্যৈঃ।।২৬
অনুবাদ
রাজন্যবর্গসহ ধৃতরাষ্ট্রপুত্রগণ সকলে এবং ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ ও আমাদের প্রধান প্রধান যোদ্ধাগণ —
বক্ত্রাণি তে ত্বরমাণা বিশন্তি দংষ্ট্রাকরালানি ভয়ানকানি।
কেচিদ্বিলগ্না দশনান্তরেষু সন্দৃশ্যন্তে চূর্ণিতৈরুত্তমাঙ্গৈঃ।।২৭
অনুবাদ
দ্রুত ধাবিত হইয়া তোমার দংষ্ট্রাকরাল ভয়ঙ্করদর্শন মুখগহ্বরে প্রবেশ করিতেছে। কাহারও কাহারও মস্তক চূর্ণবিচূর্ণ হইয়া গিয়াছে এবং উহা তোমার দন্তসন্ধিতে সংলগ্ন হইয়া রহিয়াছে।
যথা নদীনাং বহবোহম্বুবেগাঃ সমুদ্রমেবাভিমুখা দ্রবন্তি।
তথা তবামী নরলোকবীরা বিশন্তি বক্ত্রাণ্যভিবিজ্বলন্তি।।২৮
অনুবাদ
নদীসমূহের বহু জলপ্রবাহ সমুদ্রাভিমুখ হইয়া যেমন সমুদ্রে গিয়া প্রবেশ করে — সেইরূপ তোমার সর্বতোব্যাপ্ত জ্বলন্ত মুখগহ্বরে প্রবেশ করিতেছে এই মনুষ্যলোকের বীরগণ।
যথা প্রদীপ্তং জ্বলনং পতঙ্গা বিশন্তি নাশায় সমৃদ্ধবেগাঃ।
তথৈব নাশায় বিশন্তি লোকাস্তবাপি বক্ত্রাণি সমৃদ্ধবেগাঃ।।২৯
অনুবাদ
পতঙ্গগণ যেমন অতি বেগে ধাবমান হইয়া মরণের জন্য জ্বলন্ত অগ্নিতে প্রবেশ করে — সেই রকম অতি বেগে এই লোকসকল মরণের নিমিত্তই তোমার মুখগহ্বরে প্রবেশ করিতেছে।
লেলিহ্যসে গ্রসমানঃ সমন্তাল্লোকান্ সমগ্রান্ বদনৈর্জ্বলদ্ভিঃ।
তেজোভিরাপূর্য জগৎ সমগ্রং ভাসস্তবোগ্রাঃ প্রতপন্তি বিষ্ণো।।৩০
অনুবাদ
লোকসমূহকে তুমি জ্বলন্ত মুখসমূহের দ্বারা গ্রাস করিয়া বারবার স্বাদগ্রহণ করিতেছ। হে বিষ্ণো, সমগ্র জগৎ তোমার তীব্র তেজোরাশিদ্বারা ব্যাপ্ত হইয়া প্রতপ্ত হইয়া উঠিয়াছে।
আখ্যাহি মে কো ভবানুগ্ররূপো নমোহস্তু তে দেববর প্রসীদ।
বিজ্ঞাতুমিচ্ছামি ভবন্তমাদ্যং ন হি প্রজানামি তব প্রবৃত্তিম্।।৩১
অনুবাদ
আপনি কে, উগ্রমূর্তি — আমায়ে বলুন। হে দেববর, আপনাকে প্রণাম করি, প্রসন্ন হউন। আদি পুরুষ আপনাকে আমি জানিতে ইচ্ছা করি। আপনি কে, কি কার্যে প্রবৃত্ত — বুঝিতেছি না।
কালোহস্মি লোকক্ষয়কৃৎ প্রবৃদ্ধো লোকান্ সমাহর্তুমিহ প্রবৃত্তঃ।
ঋতেহপি ত্বাং ন ভবিষ্যন্তি সর্বে যেহবস্থিতাঃ প্রত্যনীকেষু যোধাঃ।।৩২
অনুবাদ
শ্রীভগবান বলিলেন — প্রবৃদ্ধকাল আমি, লোকক্ষয়কারী। এক্ষণে এই লোকদিগকে সংহার করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছি। তুমি যুদ্ধ না করিলেও প্রতিপক্ষ সৈন্যদলের সে সকল যোদ্ধা কেহই থাকিবে না।
তস্মাত্ত্বমুত্তিষ্ঠ যশো লভস্ব জিত্বা শত্রুন্ ভুঙ্ক্ষ্ব রাজ্যং সমৃদ্ধম্।
ময়ৈবৈতে নিহতাঃ পূর্বমেব নিমিত্তমাত্রং ভব সব্যসাচিন্।।৩৩
অনুবাদ
অতএব তুমি উত্থিত হও, যশঃ লাভ করো, শত্রু জয় করিয়া নিষ্কণ্টক রাজ্য ভোগ করো। হে অর্জুন, আমি ইহাদিগকে পূর্বেই নিহত করিয়াছি — এখন তুমি নিমিত্তমাত্র হও।
দ্রোণঞ্চ ভীষ্মঞ্চ জয়দ্রথঞ্চ কর্ণং তথান্যানপি যোধবীরান্।
ময়া হতাংস্ত্বং জহি মা ব্যথিষ্ঠা যুধ্যস্ব জেতাসি রণে সপত্নান্।।৩৪
অনুবাদ
দ্রোণ, ভীষ্ম, জয়দ্রথ, কর্ণ এবং অন্যান্য যুদ্ধবীরগণকে আমি পূর্বেই নিহত করিয়া রাখিয়াছি। তুমি সেই হতগণকে নিহত করো, ভয় করিও না, রণে শত্রুগণকে নিশ্চয় জয় করিতে পারিবে।
এতচ্ছ্রুত্বা বচনং কেশবস্য কৃতাঞ্জলির্বেপমানঃ কিরীটী।
নমস্কৃত্বা ভূয় এবাহ কৃষ্ণং সগদ্গদং ভীতভীতঃ প্রণম্য।।৩৫
অনুবাদ
সঞ্জয় কহিলেন — শ্রীকৃষ্ণের সেই বাক্য শ্রবণ করিয়া অর্জুন কম্পিত কলেবরে কৃতাঞ্জলিপুটে কৃষ্ণকে নমস্কার করিলেন। ভীত হইয়া আবার প্রণামপূর্বক গদগদ স্বরে বলিতে লাগিলেন।
স্থানে হৃষীকেশ তব প্রকীর্ত্যা জগৎ প্রহৃষ্যত্যনুরজ্যতে চ।
রক্ষাংসি ভীতানি দিশো দ্রবন্তি সর্বে নমস্যন্তি চ সিদ্ধসঙ্ঘাঃ।।৩৬
অনুবাদ
অর্জুন বলিলেন — হে হৃষীকেশ, তোমার মাহাত্ম্যকীর্তনে সমস্ত জগৎ হৃষ্ট হয় ও তোমার প্রতি অনুরক্ত হয় — ইহা যুক্তিযুক্ত। চতুর্দিকে রাক্ষসেরা ভীত হইয়া পলায়ন করে এবং সিদ্ধগণ তোমাকে নমস্কার করেন।
কস্মাচ্চ তে ন নমেরন্ মহাত্মন্ গরীয়সে ব্রহ্মণোহপ্যাদিকর্ত্রে।
অনন্ত দেবেশ জগন্নিবাস ত্বমক্ষরং সদসৎ তৎপরং যৎ।।৩৭
অনুবাদ
হে মহাত্মন্, হে অনন্ত, হে দেবেশ, হে জগন্নিবাস — তুমি ব্রহ্মারও গুরু এবং আদিকর্তা। অতএব সমস্ত জগৎ কেন তোমাকে নমস্কার না করিবে? তুমি সৎ, তুমি অসৎ এবং সতের অতীত যে অক্ষরব্রহ্ম তাহাও তুমি।
ত্বমাদিদেবঃ পুরুষঃ পুরাণস্ত্বমস্য বিশ্বস্য পরং নিধানম্।
বেত্তাসি বেদ্যঞ্চ পরঞ্চ ধাম ত্বয়া ততং বিশ্বমনন্তরূপ।।৩৮
অনুবাদ
হে অনন্তরূপ, তুমি আদিদেব, অনাদি পুরুষ তুমি। তুমি এই বিশ্বের একমাত্র লয়স্থান। তুমি জ্ঞাতা, তুমিই জ্ঞাতব্য, তুমিই পরমধাম। তুমি এই বিশ্ব ব্যাপিয়া অবস্থান করিতেছ।
বায়ুর্যমোহগ্নির্বরুণঃ শশাঙ্কঃ প্রজাপতিস্ত্বং প্রপিতামহশ্চ।
নমো নমস্তেহস্তু সহস্রকৃত্বঃ পুনশ্চ ভূয়োহপি নমো নমস্তে।।৩৯
অনুবাদ
তুমিই বায়ু, যম, অগ্নি, বরুণ, চন্দ্র। তুমি পিতামহ ব্রহ্ম এবং ব্রহ্মার জনকও তুমি। নমস্কার করি তোমাকে সহস্র বার। আবার পুনরায় তোমাকে নমস্কার করি।
নমঃ পুরস্তাদথ পৃষ্ঠতস্তে নমোহস্তু তে সর্বত এব সর্ব।
অনন্তবীর্যামিতবিক্রমস্ত্বং সর্বং সমাপ্নোষি ততোহসি সর্বঃ।।৪০
অনুবাদ
সামনে তোমাকে নমস্কার করি, পশ্চাতে তোমাকে নমস্কার করি। হে সর্বস্বরূপ, সর্বত্রই তুমি, তোমাকে সকল দিকেই নমস্কার করি। অনন্ত তোমার বলবীর্য, অসীম তোমার পরাক্রম। সমস্ত ব্যাপিয়া রহিয়াছ তুমি — অতএব সমস্তটাই তুমিই।
সখেতি মত্বা প্রসভং যদুক্তং হে কৃষ্ণ হে যাদব হে সখেতি।
অজানতা মহিমানং তবেদং ময়া প্রমাদাৎ প্রণয়েন বাপি।।৪১
অনুবাদ
তোমার এই বিশ্বরূপ ও ঐশ্বর্যমহিমা না জানিয়া তোমাকে সখা ভাবিয়া অজ্ঞানবশতঃ বা প্রণয়বশতঃ — 'হে কৃষ্ণ, হে যাদব, হে সখা' — এইরূপ তোমায় বলিয়াছি।
যচ্চাবহাসার্থমসৎকৃতোহসি বিহারশয্যাসনভোজনেষু।
একোহথবাপ্যচ্যুত তৎসমক্ষং তৎক্ষামযে ত্বামহমপ্রমেয়ম্।।৪২
অনুবাদ
হে অচ্যুত, আহার, বিহার, শয়ন ও উপবেশনকালে একা অথবা বন্ধুজনসমক্ষে পরিহাসচ্ছলে তোমার কত অমর্যাদা করিয়াছি — অচিন্ত্যপ্রভাব তুমি, তোমার কাছে তজ্জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি।
পিতাসি লোকস্য চরাচরস্য ত্বমস্য পূজ্যশ্চ গুরুর্গরীয়ান্।
ন ত্বৎসমোহস্ত্যভ্যধিকঃ কুতোহন্যো লোকত্রযেহপ্যপ্রতিমপ্রভাব।।৪৩
অনুবাদ
হে অমিতপ্রভাব, চরাচর সমস্ত লোকের পিতা তুমি। তুমি পূজ্য, গুরু ও গুরু হইতে গুরুতর। এই ত্রিজগতে তোমার মতো কেহ নাই — শ্রেষ্ঠ তোমা অপেক্ষা থাকিবে কি প্রকারে?
তস্মাৎ প্রণম্য প্রণিধায় কায়ং প্রসাদয়ে ত্বামহমীশমীড্যম্।
পিতেব পুত্রস্য সখেব সখ্যুঃ প্রিয়ঃ প্রিয়ায়ার্হসি দেব সোঢুম্।।৪৪
অনুবাদ
হে দেব, আমি পূর্বোক্তরূপে অপরাধী। সেই জন্য দণ্ডবৎ প্রণামপূর্বক তোমার প্রসাদ প্রার্থনা করিতেছি। তুমি সকলের বন্দনীয় ঈশ্বর। পুত্র যেমন পিতার, সখা যেমন সখার, প্রিয় যেমন প্রিয়কে ক্ষমা করেন — আমার অপরাধ তুমিও ক্ষমা করো।
অদৃষ্টপূর্বং হৃষিতোহস্মি দৃষ্ট্বা ভয়েন চ প্রব্যথিতং মনো মে।
তদেব মে দর্শয় দেব রূপং প্রসীদ দেবেশ জগন্নিবাস।।৪৫
অনুবাদ
হে দেব, আগে যাহা দেখি নাই সেই রূপ দেখিয়া আমার হর্ষ হইয়াছে বটে, কিন্তু ভয়ে মন ব্যাকুল হইয়া উঠিয়াছে। অতএব তোমার পূর্বরূপটিকে আমায় দেখাও। হে দেবেশ, হে জগন্নিবাস, প্রসন্ন হও।
কিরীটিনং গদিনং চক্রহস্তমিচ্ছামি ত্বাং দ্রষ্টুমহং তথৈব।
তেনৈব রূপেণ চতুর্ভুজেন সহস্রবাহো ভব বিশ্বমূর্তে।।৪৬
অনুবাদ
কিরীটধারী ও গদা ও চক্রহস্ত তোমার সেই পূর্বরূপই আমি দেখিতে ইচ্ছা করি। হে সহস্রবাহো, হে বিশ্বমূর্তি, তুমি চতুর্ভুজ মূর্তি ধারণ করো।
ময়া প্রসন্নেন তবার্জুনেদং রূপং পরং দর্শিতমাত্মযোগাৎ।
তেজোময়ং বিশ্বমনন্তমাদ্যং যন্মে ত্বদন্যেন ন দৃষ্টপূর্বম্।।৪৭
অনুবাদ
শ্রীভগবান কহিলেন — প্রসন্ন হইয়া আমি স্বকীয় যোগপ্রভাবেই এই তেজোময়, অনন্ত, আদ্য, বিশ্বাত্মক পরমরূপ তোমাকে দেখাইলাম — তুমি ভিন্ন কেহ পূর্বে এই রূপ দেখে নাই।
ন বেদযজ্ঞাধ্যয়নৈর্ন দানৈর্ন চ ক্রিয়াভির্ন তপোভিরুগ্রৈঃ।
এবংরূপঃ শক্য অহং নৃলোকে দ্রষ্টুং ত্বদন্যেন কুরুপ্রবীর।।৪৮
অনুবাদ
হে কুরুপ্রবীর, না বেদাধ্যয়ন দ্বারা, না যজ্ঞবিদ্যার অনুশীলন দ্বারা, না দানাদি ক্রিয়াদ্বারা, না উগ্র তপস্যা দ্বারা — মনুষ্যলোকে তুমি ভিন্ন আর কেহ আমার ঈদৃশ রূপ দেখিতে সক্ষম হয়।
মা তে ব্যথা মা চ বিমূঢ়ভাবো দৃষ্ট্বা রূপং ঘোরমীদৃঙ্মামেদম্।
ব্যপেতভীঃ প্রীতমনাঃ পুনস্ত্বং তদেব মে রূপমিদং প্রপশ্য।।৪৯
অনুবাদ
আমার এই ঘোররূপ দেখিয়া তুমি ব্যথিত হইও না, বিমূঢ় হইও না। প্রীতমনে পুনরায় ভয় ত্যাগ করিয়া তুমি আমার পূর্বরূপ দর্শন করো।
ইত্যর্জুনং বাসুদেবস্তথোক্ত্বা স্বকং রূপং দর্শয়ামাস ভূয়ঃ।
আশ্বাসয়ামাস চ ভীতমেনং ভূত্বা পুনঃ সৌম্যবপুর্মহাত্মা।।৫০
অনুবাদ
সঞ্জয় কহিলেন — অর্জুনকে বাসুদেব এই বলিয়া আবার সেই স্বীয় মূর্তি দেখাইলেন। অর্জুনকে আশ্বস্ত করিলেন। মহাত্মা পুনরায় প্রসন্নমূর্তি ধারণ করিয়া।
দৃষ্টেদং মানুষং রূপং তব সৌম্যং জনার্দন।
ইদানীমস্মি সংবৃত্তঃ সচেতাঃ প্রকৃতিং গতঃ।।৫১
অনুবাদ
অর্জুন কহিলেন — হে জনার্দন, তোমার সৌম্য মানুষ রূপ দর্শন করিয়া আমি এখন প্রসন্নচিত্ত ও প্রকৃতিস্থ হইলাম।
সুদুর্দর্শমিদং রূপং দৃষ্টবানসি যন্মম।
দেবা অপ্যস্য রূপস্য নিত্যং দর্শনকাঙ্ক্ষিণঃ।।৫২
অনুবাদ
শ্রীভগবান কহিলেন — যে রূপ তুমি আমার দেখিলে — একান্ত কঠিন উহার দর্শনলাভ। দেবগণও সর্বদা এই রূপের দর্শনাকাঙ্ক্ষী।
নাহং বেদৈর্ন তপসা ন দানেন ন চেজ্যয়া।
শক্য এবংবিধো দ্রষ্টুং দৃষ্টবানসি মাং যথা।।৫৩
অনুবাদ
যে রূপে আমাকে দেখিলে এই রূপ — তপস্যা, দান, বেদাধ্যয়ন, যজ্ঞ কোনো কিছু দ্বারাই দর্শন করা যায় না।
ভক্ত্যা ত্বনন্যয়া শক্য অহমেবংবিধোহর্জুন।
জ্ঞাতুং দ্রষ্টুং চ তত্ত্বেন প্রবেষ্টুং চ পরন্তপ।।৫৪
অনুবাদ
হে পরন্তপ, হে অর্জুন, কেবল অনন্যা ভক্তিদ্বারাই ঈদৃশ আমাকে স্বরূপতঃ জানিতে পারা যায়, সাক্ষাৎ দেখিতে পারা যায় ও আমাতে প্রবেশ করিতে পারা যায়।
মৎকর্মকৃন্মৎপরমো মদ্ভক্তঃ সঙ্গবর্জিতঃ।
নির্বৈরঃ সর্বভূতেষু যঃ স মামেতি পাণ্ডব।।৫৫
অনুবাদ
হে পাণ্ডব, আমারই কর্মবোধে যে ব্যক্তি সমুদয় কর্ম করেন, একমাত্র গতি যাঁহার আমি, সর্বপ্রকার ভজনা করেন যিনি, সমস্ত বিষয়ে আসক্তিশূন্য যিনি, কাহারও উপর শত্রুভাব নাই যাঁহার — তিনিই আমাকে প্রাপ্ত হন।
ইতি বিশ্বরূপদর্শনযোগ নামক
একাদশ অধ্যায় সমাপ্ত।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতোপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং
যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে
বিশ্বরূপদর্শনযোগো নাম একাদশোহধ্যায়ঃ