পরং ভূয়ঃ প্রবক্ষ্যামি জ্ঞানানাং জ্ঞানমুত্তমম্।
যজ্জ্ঞাত্বা মুনয়ঃ সর্বে পরাং সিদ্ধিমিতো গতাঃ।।১
অনুবাদ
শ্রীভগবান বলিলেন — আমি পুনরায় জ্ঞানসমূহের মধ্যে সর্বোত্তম জ্ঞান বলিতেছি — মুনিগণ যাহা জানিয়া মোক্ষলাভ করিয়াছেন।
ইদং জ্ঞানমুপাশ্রিত্য মম সাধর্ম্যমাগতাঃ।
সর্গেহপি নোপজায়ন্তে প্রলয়ে ন ব্যথন্তি চ।।২
অনুবাদ
যাঁহারা এই জ্ঞান আশ্রয় করিয়া আমার ত্রিগুণাতীত অবস্থা প্রাপ্ত হন — তাঁহারা সৃষ্টিকালেও জন্মলাভ করেন না, প্রলয়কালেও ব্যথিত হন না।
মম যোনির্মহদ্ ব্রহ্ম তস্মিন্ গর্ভং দধাম্যহম্।
সম্ভবঃ সর্বভূতানাং ততো ভবতি ভারত।।৩
অনুবাদ
হে ভারত, আমার গর্ভাধানস্থান মহৎ প্রকৃতিই। তাহাতে আমি গর্ভাধান করি — সর্বভূতের উৎপত্তি হয় তাহা হইতেই।
সর্বযোনিষু কৌন্তেয় মূর্তয়ঃ সম্ভবন্তি যাঃ।
তাসাং ব্রহ্ম মহদ্ যোনিরহং বীজপ্রদঃ পিতা।।৪
অনুবাদ
হে কৌন্তেয়, দেব মনুষ্যাদি বিভিন্ন যোনিতে যে সকল শরীর উৎপন্ন হয় — প্রকৃতি তাহাদের মাতৃস্থানীয়া এবং আমিই গর্ভাধানকর্তা পিতা।
সত্ত্বং রজস্তম ইতি গুণাঃ প্রকৃতিসম্ভবাঃ।
নিবধ্নন্তি মহাবাহো দেহে দেহিনমব্যয়ম্।।৫
অনুবাদ
হে মহাবাহো, সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ — প্রকৃতিজাত এই তিন গুণ দেহমধ্যে অব্যয় আত্মাকে বন্ধন করিয়া রাখে।
তত্র সত্ত্বং নির্মলত্বাৎ প্রকাশকমনাময়ম্।
সুখসঙ্গেন বধ্নাতি জ্ঞানসঙ্গেন চানঘ।।৬
অনুবাদ
হে অনঘ, এই তিন গুণের মধ্যে সত্ত্বগুণ নির্মল বলিয়া প্রকাশক এবং নির্দোষ। এই সত্ত্বগুণ সুখসঙ্গ ও জ্ঞানসঙ্গ দ্বারা আত্মাকে বন্ধন করিয়া রাখে।
রজো রাগাত্মকং বিদ্ধি তৃষ্ণাসঙ্গসমুদ্ভবম্।
তন্নিবধ্নাতি কৌন্তেয় কর্মসঙ্গেন দেহিনম্।।৭
অনুবাদ
হে কৌন্তেয়, রজোগুণ রাগাত্মক — তৃষ্ণা ও আসক্তি উহা হইতে উৎপন্ন হয়। উহা কর্মাসক্তিদ্বারা দেহিকে বন্ধন করে।
তমস্ত্বজ্ঞানজং বিদ্ধি মোহনং সর্বদেহিনাম্।
প্রমাদালস্যনিদ্রাভিস্তন্নিবধ্নাতি ভারত।।৮
অনুবাদ
হে ভারত, তমোগুণ অজ্ঞানজাত এবং সর্বদেহিগণের ভ্রান্তিজনক। জীবনকে ইহা প্রমাদ, আলস্য ও নিদ্রা দ্বারা আবদ্ধ করে।
সত্ত্বং সুখে সঞ্জয়তি রজঃ কর্মণি ভারত।
জ্ঞানমাবৃত্য তু তমঃ প্রমাদে সঞ্জয়ত্যুত।।৯
অনুবাদ
হে ভারত, সত্ত্বগুণ জীবনকে সুখে আসক্ত করে এবং রজোগুণ কর্মে আসক্ত করে। কিন্তু তমোগুণ জ্ঞানকে আবৃত করিয়া প্রমাদে আসক্ত করে।
রজস্তমশ্চাভিভূয় সত্ত্বং ভবতি ভারত।
রজঃ সত্ত্বং তমশ্চৈব তমঃ সত্ত্বং রজস্তথা।।১০
অনুবাদ
হে ভারত, সত্ত্বগুণ রজঃ ও তমোগুণকে অভিভূত করিয়া প্রবল হয়। রজোগুণ তমঃ ও সত্ত্বগুণকে অভিভূত করিয়া প্রবল হয় এবং তমোগুণ রজঃ ও সত্ত্বগুণকে অভিভূত করিয়া প্রবল হয়।
সর্বদ্বারেষু দেহেহস্মিন্ প্রকাশ উপজায়তে।
জ্ঞানং যদা তদা বিদ্যাদ্বিবৃদ্ধং সত্ত্বমিত্যুত।।১১
অনুবাদ
এই দেহে যখন শ্রোত্রাদি সর্ব ইন্দ্রিয়দ্বারে নির্মল জ্ঞানের প্রকাশ উৎপন্ন হয় — সত্ত্বগুণ বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইয়াছে তখন জানিবে।
লোভঃ প্রবৃত্তিরারম্ভঃ কর্মণামশমঃ স্পৃহা।
রজস্যেতানি জায়ন্তে বিবৃদ্ধে ভরতর্ষভ।।১২
অনুবাদ
হে ভরতশ্রেষ্ঠ, লোভ, সর্বদা কর্মে প্রবৃত্তি, কর্মে উদ্যম, শান্তি ও তৃপ্তির অভাব, বিষয়স্পৃহা — এই সকল লক্ষণ রজোগুণ বৃদ্ধি পাইলে উৎপন্ন হয়।
অপ্রকাশোহপ্রবৃত্তিশ্চ প্রমাদো মোহ এব চ।
তমস্যেতানি জায়ন্তে বিবৃদ্ধে কুরুনন্দন।।১৩
অনুবাদ
হে কুরুনন্দন, তমোগুণ বৃদ্ধি পাইলে বিবেকভ্রংশ, নিরুদ্যমতা, কর্তব্যের বিস্মরণ ও মোহ বৃদ্ধি — এই সকল লক্ষণ উৎপন্ন হয়।
যদা সত্ত্বে প্রবৃদ্ধে তু প্রলয়ং যাতি দেহভৃৎ।
তদোত্তমবিদাং লোকানমলান্ প্রতিপদ্যতে।।১৪
অনুবাদ
জীবের মৃত্যু যদি সত্ত্বগুণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হইলে হয় — তবে তিনি উত্তম তত্ত্ববিদ্গণের প্রাপ্য প্রকাশময় দিব্য লোকসকল প্রাপ্ত হন।
রজসি প্রলয়ং গত্বা কর্মসঙ্গিষু জায়তে।
তথা প্রলীনস্তমসি মূঢ়যোনিষু জায়তে।।১৫
অনুবাদ
রজোগুণের বৃদ্ধিকালে মৃত্যু হইলে কর্মাসক্ত মনুষ্য যোনিতে জন্ম হয় এবং তমোগুণের বৃদ্ধিকালে মৃত্যু হইলে পশ্বাদি মূঢ় যোনিতে জন্ম হয়।
কর্মণঃ সুকৃতস্যাহুঃ সাত্ত্বিকং নির্মলং ফলম্।
রজসস্তু ফলং দুঃখমজ্ঞানং তমসঃ ফলম্।।১৬
অনুবাদ
নির্মল সুখ সাত্ত্বিক পুণ্যকর্মের ফল। রাজসিক কর্মের ফল দুঃখ এবং তামসিক কর্মের ফল অজ্ঞান — তত্ত্বদর্শিগণ এইরূপ বলিয়া থাকেন।
সত্ত্বাৎ সঞ্জায়তে জ্ঞানং রজসো লোভ এব চ।
প্রমাদমোহৌ তমসো ভবতোহজ্ঞানমেব চ।।১৭
অনুবাদ
জ্ঞান উৎপন্ন হয় সত্ত্বগুণ হইতে। রজোগুণ হইতে লোভ উৎপন্ন হয়। তমোগুণ হইতে অজ্ঞান, প্রমাদ ও মোহ উৎপন্ন হইয়া থাকে।
ঊর্ধ্বং গচ্ছন্তি সত্ত্বস্থা মধ্যে তিষ্ঠন্তি রাজসাঃ।
জঘন্যগুণবৃত্তিস্থা অধো গচ্ছন্তি তামসাঃ।।১৮
অনুবাদ
সত্ত্বগুণ প্রধান ব্যক্তি ঊর্ধ্বলোকে অর্থাৎ স্বর্গাদি লোকে গমন করেন। রজঃপ্রধান ব্যক্তিগণ মধ্যলোকে অর্থাৎ ভূলোকে অবস্থান করেন। প্রমাদ-মোহাদি নিকৃষ্টগুণসম্পন্ন তমঃপ্রধান ব্যক্তিগণ অধোগামী হয়।
নান্যং গুণেভ্যঃ কর্তারং যদা দ্রষ্টানুপশ্যতি।
গুণেভ্যশ্চ পরং বেত্তি মদ্ভাবং সোহধিগচ্ছতি।।১৯
অনুবাদ
যখন দ্রষ্টা জীব গুণ ভিন্ন অন্য কাহাকেও কর্তা না দেখেন এবং তিন গুণের অতীত পরম বস্তু আত্মাকে জ্ঞাত হন — তখন তিনি আমার ব্রহ্মভাব বা ত্রিগুণাতীত অবস্থা প্রাপ্ত হন।
গুণানেতানতীত্য ত্রীন্ দেহী দেহসমুদ্ভবান্।
জন্মমৃত্যুজরাদুঃখৈর্বিমুক্তোহমৃতমশ্নুতে।।২০
অনুবাদ
জীব দেহোৎপত্তির কারণভূত এই তিন গুণ অতিক্রম করিয়া জন্ম-মৃত্যু-জরাদুঃখ হইতে বিমুক্ত হইয়া অমৃতত্ব অর্থাৎ মোক্ষ লাভ করেন।
কৈর্লিঙ্গৈস্ত্রীন্ গুণানেতানতীতো ভবতি প্রভো।
কিমাচারঃ কথং চৈতাংস্ত্রীন্ গুণানতিবর্ততে।।২১
অনুবাদ
অর্জুন বলিলেন — হে প্রভো, কোন্ লক্ষণের দ্বারা জানা যায় যে জীব ত্রিগুণ অতিক্রম করিয়াছেন? তাঁহার আচার কেমন? এবং তিনি ত্রিগুণ অতিক্রম করেন কি প্রকারে?
প্রকাশঞ্চ প্রবৃত্তিঞ্চ মোহমেব চ পাণ্ডব।
ন দ্বেষ্টি সম্প্রবৃত্তানি ন নিবৃত্তানি কাঙ্ক্ষতি।।২২
অনুবাদ
শ্রীভগবান কহিলেন — হে পাণ্ডব, সত্ত্বগুণের কার্য প্রকাশ বা জ্ঞান, রজোগুণের ধর্ম কর্মপ্রবৃত্তি এবং তমোগুণের ধর্ম মোহ — এই সকল গুণকার্য প্রবৃত্ত হইলেও যিনি দ্বেষ করেন না এবং নিবৃত্ত থাকিলেও যিনি আকাঙ্ক্ষা করেন না — তিনিই গুণাতীত।
উদাসীনবদাসীনো গুণৈর্যো ন বিচাল্যতে।
গুণা বর্তন্ত ইত্যেবং যোহবতিষ্ঠতি নেঙ্গতে।।২৩
অনুবাদ
উদাসীনের ন্যায় সাক্ষিস্বরূপে যিনি অবস্থান করেন, সত্ত্বাদি গুণকার্য সুখদুঃখাদি কর্তৃক বিচলিত হন না। 'গুণসকল স্ব স্ব কার্যে বর্তমান, আমার সহিত উহার কোনো সম্পর্ক নাই' — ইহা মনে করিয়া যিনি চঞ্চল হন না তিনি গুণাতীত।
সমদুঃখসুখঃ স্বস্থঃ সমলোষ্টাশ্মকাঞ্চনঃ।
তুল্যপ্রিয়াপ্রিয়ো ধীরস্তুল্যনিন্দাত্মসংস্তুতিঃ।।২৪
অনুবাদ
সুখদুঃখ যাঁহার কাছে সমান, যিনি আত্মরূপেই স্থিত, মৃত্তিকা-প্রস্তর ও সুবর্ণ যাঁহার নিকট সমান, যিনি প্রিয় ও অপ্রিয় এবং আপনার নিন্দা ও প্রশংসা তুল্য মনে করেন, যিনি ধৈর্যযুক্ত — তিনিই গুণাতীত।
মানাপমানয়োস্তুল্যস্তুল্যো মিত্রারিপক্ষয়োঃ।
সর্বারম্ভপরিত্যাগী গুণাতীতঃ স উচ্যতে।।২৫
অনুবাদ
শত্রুপক্ষে ও মিত্রপক্ষে, মানে ও অপমানে যাঁহার তুল্যজ্ঞান এবং ফলাকাঙ্ক্ষা করিয়া যিনি কর্মোদ্যম করেন না — এরূপ ব্যক্তিকে বলা হয় গুণাতীত।
মাঞ্চ যোহব্যভিচারেণ ভক্তিযোগেন সেবতে।
স গুণান্ সমতীত্যৈতান্ ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে।।২৬
অনুবাদ
আমার সেবা যিনি ঐকান্তিক ভক্তিযোগ সহকারে করেন — এই তিন গুণ অতিক্রম করিয়া তিনি ব্রহ্মভাব লাভে সমর্থ হন।
ব্রহ্মণো হি প্রতিষ্ঠাহহমমৃতস্যাব্যয়স্য চ।
শাশ্বতস্য চ ধর্মস্য সুখস্যৈকান্তিকস্য চ।।২৭
অনুবাদ
আমি নিত্য অমৃতের — অতএব মোক্ষের, সনাতন ধর্মের এবং ঐকান্তিক সুখের — ব্রহ্মের প্রতিষ্ঠা।
ইতি গুণত্রয়বিভাগযোগ নামক
চতুর্দশ অধ্যায় সমাপ্ত।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতোপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং
যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে
গুণত্রয়বিভাগযোগো নাম চতুর্দশোহধ্যায়ঃ