অভয়ং সত্ত্বসংশুদ্ধির্জ্ঞানযোগব্যবস্থিতিঃ।
দানং দমশ্চ যজ্ঞশ্চ স্বাধ্যায়স্তপ আর্জবম্।।১
অনুবাদ
ভয়াভাব, চিত্তশুদ্ধি, আত্মজ্ঞান ও কর্মযোগে অবস্থিতি, দান, বাহ্যেন্দ্রিয় সংযম, অগ্নিহোত্রাদি, শাস্ত্রপাঠ, ব্রহ্মযজ্ঞ বা জপযজ্ঞ, তপস্যা ও সরলতা।
অহিংসা সত্যমক্রোধস্ত্যাগঃ শান্তিরপৈশুনম্।
দয়া ভূতেষ্বলোলুপ্তং মার্দবং হ্রীরচাপলম্।।২
অনুবাদ
পরপীড়া বর্জন, ক্রোধহীনতা, কামনা বা কর্মফল ত্যাগ, শান্তি, পরনিন্দাবর্জন, উদারতা, জীবে দয়া, লোভশূন্যতা, মৃদুতা, কুকর্মে লোকলজ্জা, অচাঞ্চল্য।
তেজঃ ক্ষমা ধৃতিঃ শৌচমদ্রোহো নাতিমানিতা।
ভবন্তি সম্পদং দৈবীমভিজাতস্য ভারত।।৩
অনুবাদ
তেজস্বিতা, ক্ষমা, ধৈর্য, শৌচ, অবিরোধ, অনভিমান — এই সকল গুণ দৈবী সম্পদ অভিমুখে জাত ব্যক্তির হইয়া থাকে।
দম্ভো দর্পোহভিমানশ্চ ক্রোধঃ পারুষ্যমেব চ।
অজ্ঞানং চাভিজাতস্য পার্থ সম্পদমাসুরীম্।।৪
অনুবাদ
হে পার্থ, দম্ভ, দর্প, অভিমান, ক্রোধ, নিষ্ঠুরতা এবং অজ্ঞান — এই সকল আসুরী সম্পদ অভিমুখে জাত ব্যক্তি প্রাপ্ত হয়।
দৈবী সম্পদ্বিমোক্ষায় নিবন্ধায়াসুরী মতা।
মা শুচঃ সম্পদং দৈবীমভিজাতোহসি পাণ্ডব।।৫
অনুবাদ
দৈবী সম্পদ মোক্ষের হেতু এবং আসুরী সম্পদ সংসারবন্ধনের কারণ হয়। হে পাণ্ডব, শোক করিও না, কারণ তুমি দৈবী সম্পদ অভিমুখে জন্মিয়াছ।
দ্বৌ ভূতসর্গৌ লোকেহস্মিন্ দৈব আসুর এব চ।
দৈবো বিস্তরশঃ প্রোক্ত আসুরং পার্থ মে শৃণু।।৬
অনুবাদ
হে পার্থ, এই জগতে দুই প্রকার প্রাণির সৃষ্টি হয় — দৈব ও আসুর। দৈবী প্রকৃতির বর্ণনা সবিস্তার করিয়াছি। এক্ষণে আসুরী প্রকৃতির কথা আমার নিকট শ্রবণ করো।
প্রবৃত্তিঞ্চ নিবৃত্তিঞ্চ জনা ন বিদুরাসুরাঃ।
ন শৌচং নাপি চাচারো ন সত্যং তেষু বিদ্যতে।।৭
অনুবাদ
আসুরভাবাপন্ন ব্যক্তিগণ জানে না যে ধর্মে প্রবৃত্তি কি বা অধর্ম হইতে নিবৃত্তিই বা কি — অর্থাৎ তাহাদের ধর্মাধর্ম, কর্তব্যাকর্তব্য জ্ঞান নাই। অতএব তাহাদের মধ্যে শৌচ, সদাচার বা সত্য কিছুই নাই।
অসত্যমপ্রতিষ্ঠং তে জগদাহুরনীশ্বরম্।
অপরস্পরসম্ভূতং কিমন্যৎ কামহৈতুকম্।।৮
অনুবাদ
এই জগতে সত্য বলিয়া কোনো পদার্থ নাই, ধর্মাধর্মের কোনো ব্যবস্থা নাই এবং ঈশ্বর বলিয়াও কোনো বস্তু নাই — এই আসুর প্রকৃতির লোকেরা বলিয়া থাকে। ইহা কেবল স্ত্রী-পুরুষের কামই একমাত্র কারণ।
এতাং দৃষ্টিমবষ্টভ্য নষ্টাত্মানোহল্পবুদ্ধয়ঃ।
প্রভবন্ত্যুগ্রকর্মাণঃ ক্ষয়ায় জগতোহহিতাঃ।।৯
অনুবাদ
পূর্বোক্ত দৃষ্টি অবলম্বন করিয়া বিকৃতমতি, অল্পবুদ্ধি, ক্রুরকর্মা ব্যক্তিগণ অহিত্যচরণে প্রবৃত্ত হয় — তাহারা জগতের বিনাশের জন্যেই জন্মগ্রহণ করিয়া থাকে।
কামমাশ্রিত্য দুষ্পূরং দম্ভমানমদান্বিতাঃ।
মোহাদ্ গৃহীত্বাসদ্গ্রাহান্ প্রবর্তন্তেহশুচিব্রতাঃ।।১০
অনুবাদ
কখনও যাহা পূর্ণ হইবার নহে এইরূপ কামনার বশীভূত হইয়া, দম্ভ, অভিমান ও গর্বে মত্ত হইয়া, অবিবেকবশতঃ দুরাশার বশবর্তী হইয়া অশুচিব্রত অবলম্বনপূর্বক তাহারা কর্মে প্রবৃত্ত হইয়া থাকে।
চিন্তামপরিমেয়াঞ্চ প্রলয়ান্তামুপাশ্রিতাঃ।
কামোপভোগপরমা এতাবদিতি নিশ্চিতাঃ।।১১
অনুবাদ
মৃত্যুকাল পর্যন্ত অপরিমেয় বিষয়চিন্তা আশ্রয় করিয়া বিষয়ভোগনিরত এই সকল ব্যক্তি নিশ্চয় করে যে কামোপভোগই পরম পুরুষার্থ।
আশাপাশশতৈর্বদ্ধাঃ কামক্রোধপরায়ণাঃ।
ঈহন্তে কামভোগার্থমন্যায়েনার্থসঞ্চয়ান্।।১২
অনুবাদ
ইহারা শত শত আশাপাশে বন্ধ এবং কামক্রোধপরায়ণ হইয়া অসৎমার্গ অবলম্বনপূর্বক কামভোগের অর্থ সংগ্রহে সচেষ্ট হয়।
ইদমদ্য ময়া লব্ধমিদং প্রাপ্স্যে মনোরথম্।
ইদমস্তীদমপি মে ভবিষ্যতি পুনর্ধনম্।।১৩
অসৌ ময়া হতঃ শত্রুর্হনিষ্যে চাপরানপি।
ঈশ্বরোহহমহং ভোগী সিদ্ধোহহং বলবান্ সুখী।।১৪
আঢ্যোহভিজনবানস্মি কোহন্যোহস্তি সদৃশো ময়া।
যক্ষ্যে দাস্যামি মোদিষ্য ইত্যজ্ঞানবিমোহিতাঃ।।১৫
অনুবাদ
অদ্য আমার এই লাভ হইল, পরে এই ইষ্টবস্তু পাইব, এই ধন আমার আছে। এই শত্রুকে আমি পরাজিত করিয়াছি, অন্যান্যকেও হত করিব, আমি সকলের প্রভু, আমিই সকল ভোগের অধিকারী, আমি কৃতকৃত্য, বলবান, সুখী। আমি ধনবান, কুলীন, আমার তুল্য আর কে আছে — আমি যজ্ঞ করিব, দান করিব, মজা করিব — এইরূপ অজ্ঞানে বিমোহিত।
অনেকচিত্তবিভ্রান্তা মোহজালসমাবৃতাঃ।
প্রসক্তাঃ কামভোগেষু পতন্তি নরকেহশুচৌ।।১৬
অনুবাদ
এই প্রকার অজ্ঞানে বিমূঢ়, বিবিধ বিষয়চিন্তায় বিভ্রান্ত, মোহজালে জড়িত, বিষয়ভোগে আসক্ত ব্যক্তিগণ অপবিত্র নরকে পতিত হয়।
আত্মসম্ভাবিতাঃ স্তব্ধা ধনমানমদান্বিতাঃ।
যজন্তে নামযজ্ঞৈস্তে দম্ভেনাবিধিপূর্বকম্।।১৭
অনুবাদ
আত্মশ্লাঘাযুক্ত, অবিনয়ী, ধনমানের গর্বে বিমূঢ় সেই আসুর প্রকৃতির ব্যক্তিগণ দম্ভ প্রকাশ করিয়া অবিধিপূর্বক নামমাত্র যজ্ঞ করে।
অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধঞ্চ সংশ্রিতাঃ।
মামাত্মপরদেহেষু প্রদ্বিষন্তোহভ্যসূয়কাঃ।।১৮
অনুবাদ
সাধুগণের অসূয়াকারী সেই সকল ব্যক্তি অহঙ্কার, বল, দর্প, কাম ও ক্রোধের বশীভূত হইয়া স্বদেহে ও পরদেহে অবস্থিত আত্মরূপী আমাকে দ্বেষ করিয়া থাকে।
তানহং দ্বিষতঃ ক্রুরান্ সংসারেষু নরাধমান্।
ক্ষিপাম্যজস্রমশুভানাসুরীষ্বেব যোনিষু।।১৯
অনুবাদ
এই রকম দ্বেষপরবশ, ক্রুরমতি, নরাধম আসুর পুরুষগণকে আমি সংসারে আসুরী যোনিতে পুনঃ পুনঃ নিক্ষেপ করিয়া থাকি।
আসুরীং যোনিমাপন্না মূঢ়া জন্মনি জন্মনি।
মামপ্রাপ্যৈব কৌন্তেয় ততো যান্ত্যধমাং গতিম্।।২০
অনুবাদ
হে কৌন্তেয়, জন্মে জন্মে আসুরী যোনি প্রাপ্ত হয় এই সকল মূঢ় ব্যক্তি এবং আমাকে না পাইয়া শেষে আরও অধোগতি প্রাপ্ত হয়।
ত্রিবিধং নরকস্যেদং দ্বারং নাশনমাত্মনঃ।
কামঃ ক্রোধস্তথা লোভস্তস্মাদেতত্ত্রয়ং ত্যজেৎ।।২১
অনুবাদ
কাম-ক্রোধ-লোভ — এই তিনটি নরকের দ্বার এবং আত্মার নাশকারী। অতএব ইহাদের সর্বদাই ত্যাগ করা উচিত।
এতৈর্বিমুক্তঃ কৌন্তেয় তমোদ্বারৈস্ত্রিভির্নরঃ।
আচরত্যাত্মনঃ শ্রেয়স্ততো যাতি পরাং গতিম্।।২২
অনুবাদ
হে কৌন্তেয়, নরকের দ্বারস্বরূপ এই তিনটি হইতে মুক্ত হইলে মানুষ আপনার কল্যাণ সাধনপূর্বক পরমগতি প্রাপ্ত হয়।
যঃ শাস্ত্রবিধিমুৎসৃজ্য বর্ততে কামকারতঃ।
ন স সিদ্ধিমবাপ্নোতি ন সুখং ন পরাং গতিম্।।২৩
অনুবাদ
স্বেচ্ছাচারী হইয়া শাস্ত্রবিধি ত্যাগ করিয়া যে ব্যক্তি কর্মে প্রবৃত্ত হয় — সে সিদ্ধিলাভ করিতে পারে না, তাহার মোক্ষলাভ ও শান্তিসুখ হয় না।
তস্মাচ্ছাস্ত্রং প্রমাণং তে কার্যাকার্যব্যবস্থিতৌ।
জ্ঞাত্বা শাস্ত্রবিধানোক্তং কর্ম কর্তুমিহার্হসি।।২৪
অনুবাদ
অতএব কর্তব্য-অকর্তব্য নির্ধারণে শাস্ত্রই তোমার প্রমাণ। সুতরাং তুমি শাস্ত্রোক্ত ব্যবস্থা জানিয়া যথাধিকার কর্ম করিতে প্রবৃত্ত হও।
ইতি দৈবাসুরসম্পদ্বিভাগযোগ নামক
ষোড়শ অধ্যায় সমাপ্ত।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতোপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং
যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে
দৈবাসুরসম্পদ্বিভাগযোগো নাম ষোড়শোহধ্যায়ঃ