🔥

ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা

সপ্তদশ অধ্যায়

শ্রদ্ধাত্রয়বিভাগযোগ

Shraddhatraya Vibhaga Yoga

শ্লোক ২৮

ত্রিবিধ শ্রদ্ধা — সাত্ত্বিকী, রাজসী ও তামসী।
আহার, যজ্ঞ, তপস্যা ও দান — প্রতিটি তিন প্রকার।
ওঁ তৎ সৎ — ব্রহ্মের ত্রিবিধ নির্দেশ, শ্রদ্ধাহীন কর্ম অসৎ।

↓ নিচে স্ক্রল করুন
অর্জুন উবাচ
✦ শাস্ত্রবিধিহীন শ্রদ্ধার গুণ কি? ✦

যে শাস্ত্রবিধিমুৎসৃজ্য যজন্তে শ্রদ্ধয়ান্বিতাঃ।
তেষাং নিষ্ঠা তু কা কৃষ্ণ সত্ত্বমাহো রজস্তমঃ।।১

অনুবাদ

অর্জুন বলিলেন — হে কৃষ্ণ, যাঁহারা শাস্ত্রবিধি ত্যাগ করিয়া শ্রদ্ধাযুক্ত হইয়া যাগযজ্ঞ পূজাদি করিয়া থাকেন — তাঁহাদিগের নিষ্ঠা কীরূপ? সাত্ত্বিকী, রাজসী না তামসী?

শ্রীভগবানুবাচ
✦ ত্রিবিধ শ্রদ্ধা ✦

ত্রিবিধা ভবতি শ্রদ্ধা দেহিনাং সা স্বভাবজা।
সাত্ত্বিকী রাজসী চৈব তামসী চেতি তাং শৃণু।।২

অনুবাদ

শ্রীভগবান কহিলেন — দেহীদিগের সাত্ত্বিকী, রাজসী ও তামসী এই তিন প্রকারের শ্রদ্ধা আছে। উহা স্বভাবজাত অর্থাৎ পূর্বজন্মের সংস্কারপ্রসূত। তাহা বিস্তারিত বলিতেছি, শ্রবণ করো।

সত্ত্বানুরূপা সর্বস্য শ্রদ্ধা ভবতি ভারত।
শ্রদ্ধামযোহয়ং পুরুষো যো যচ্ছ্রদ্ধঃ স এব সঃ।।৩

অনুবাদ

হে ভারত, সকলেরই শ্রদ্ধা নিজ নিজ অন্তঃকরণ প্রবৃত্তি বা স্বভাবের অনুরূপ হইয়া থাকে। মনুষ্য শ্রদ্ধাময় — যে যেইরূপ শ্রদ্ধাযুক্ত, সে সেইরূপই হয়।

যজন্তে সাত্ত্বিকা দেবান্ যক্ষরক্ষাংসি রাজসাঃ।
প্রেতান্ ভূতগণাংশ্চান্যে যজন্তে তামসা জনাঃ।।৪

অনুবাদ

সাত্ত্বিক ব্যক্তিগণ দেবগণের পূজা করেন। রাজসিক প্রকৃতির ব্যক্তিগণ যক্ষরক্ষদিগের পূজা করেন এবং তামসিক প্রকৃতির ব্যক্তিগণ ভূতপ্রেতের পূজা করিয়া থাকে।

৫-৬

অশাস্ত্রবিহিতং ঘোরং তপ্যন্তে যে তপো জনাঃ।
দম্ভাহঙ্কারসংযুক্তাঃ কামরাগবলান্বিতাঃ।।৫
কর্শয়ন্তঃ শরীরস্থং ভূতগ্রামমচেতসঃ।
মাঞ্চৈবান্তঃশরীরস্থং তান্ বিদ্ধ্যাসুরনিশ্চয়ান্।।৬

অনুবাদ

দম্ভ, অহঙ্কার, কামনা ও আসক্তিযুক্ত এবং বলযুক্ত হইয়া যে সকল অবিবেকী ব্যক্তি শরীরস্থ ভূতগণকে এবং অন্তর্যামিরূপে দেহমধ্যস্থ আমাকে কৃশ করিয়া শাস্ত্রবিধিবিরুদ্ধ অত্যুগ্র তপস্যাদি করিয়া থাকে — তাহাদিগকে আসুরবুদ্ধিবিশিষ্ট বলিয়া জানিবে।

✦ ত্রিবিধ আহার ✦

আহারস্তু অপি সর্বস্য ত্রিবিধো ভবতি প্রিয়ঃ।
যজ্ঞস্তপস্তথা দানং তেষাং ভেদমিমং শৃণু।।৭

অনুবাদ

সবার প্রিয় আহার ত্রিবিধ হইয়া থাকে। সেইরূপ যজ্ঞ, তপস্যা এবং দানও ত্রিবিধ — উহাদের মধ্যে যেরূপ প্রভেদ তাহা শ্রবণ করো।

আয়ুঃসত্ত্ববলারোগ্যসুখপ্রীতিবিবর্ধনাঃ।
রস্যাঃ স্নিগ্ধাঃ স্থিরা হৃদ্যা আহারাঃ সাত্ত্বিকপ্রিয়াঃ।।৮

অনুবাদ

যাহা আয়ু, উৎসাহ, বল, আরোগ্য, চিত্তপ্রসন্নতা ও রুচি বর্ধনকারী এবং সরস, স্নেহযুক্ত, সারবান ও প্রীতিকর — এইরূপ আহার সাত্ত্বিক ব্যক্তিগণের প্রিয়।

কটুতীক্ষ্ণরুক্ষবিদাহিনঃ।
আহারা রাজসস্যেষ্টা দুঃখশোকামযপ্রদাঃ।।৯

অনুবাদ

অতি কটু, অতি অম্ল, অতি লবণাক্ত, অতি উষ্ণ, তীক্ষ্ণ, বিদাহী এবং দুঃখ, শোক ও রোগ উৎপাদক আহার রাজস ব্যক্তিগণের প্রিয়।

১০

যাতযামং গতরসং পূতি পর্যুষিতঞ্চ যৎ।
উচ্ছিষ্টমপি চামেধ্যং ভোজনং তামসপ্রিয়ম্।।১০

অনুবাদ

যে খাদ্য বহু পূর্বে পক্ব — যাহার রস শুষ্ক হইয়া গিয়াছে, যাহা দুর্গন্ধ, পর্যুষিত, উচ্ছিষ্ট ও অপবিত্র — তাহা তামস ব্যক্তিগণের প্রিয়।

✦ ত্রিবিধ যজ্ঞ ✦
১১

অফলাকাঙ্ক্ষিভির্যজ্ঞো বিধিদিষ্টো য ইজ্যতে।
যষ্টব্যমেবেতি মনঃ সমাধায় স সাত্ত্বিকঃ।।১১

অনুবাদ

ফলাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করিয়া 'যজ্ঞ করিতে হয় তাই করি' — এইরূপ অবশ্যকর্তব্য বোধে শাস্ত্রবিধি অনুসারে শান্তচিত্তে যে যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয়, তাহা সাত্ত্বিক যজ্ঞ।

১২

অভিসন্ধায় তু ফলং দম্ভার্থমপি চৈব যৎ।
ইজ্যতে ভরতশ্রেষ্ঠ তং যজ্ঞং বিদ্ধি রাজসম্।।১২

অনুবাদ

কিন্তু হে ভরতশ্রেষ্ঠ, ফললাভের উদ্দেশে এবং দম্ভার্থে যে যজ্ঞ অনুষ্ঠিত হয় — তাহাকে রাজস যজ্ঞ বলিয়া জানিবে।

১৩

বিধিহীনমসৃষ্টান্নং মন্ত্রহীনমদক্ষিণম্।
শ্রদ্ধাবিরহিতং যজ্ঞং তামসং পরিচক্ষতে।।১৩

অনুবাদ

তামস যজ্ঞ বলে — শাস্ত্রোক্ত বিধিশূন্য, অন্নদানবিহীন, শাস্ত্রোক্ত মন্ত্রহীন, দক্ষিণাহীন ও শ্রদ্ধাশূন্য যজ্ঞকে।

✦ ত্রিবিধ তপস্যা ✦
১৪

দেবদ্বিজগুরুপ্রাজ্ঞপূজনং শৌচমার্জবম্।
ব্রহ্মচর্যমহিংসা চ শারীরং তপ উচ্যতে।।১৪

অনুবাদ

শারীর তপস্যা বলে — দেব, দ্বিজ, গুরু, বিদ্বান্ ব্যক্তির পূজা, শৌচ, সরলতা, ব্রহ্মচর্য ও অহিংসাকে।

১৫

অনুদ্বেগকরং বাক্যং সত্যং প্রিয়হিতঞ্চ যৎ।
স্বাধ্যায়াভ্যসনং চৈব বাঙ্ময়ং তপ উচ্যতে।।১৫

অনুবাদ

যাহা কাহারও উদ্বেগকর হয় না, যাহা সত্য, প্রিয় ও হিতকর এইরূপ বাক্য এবং যথাবিধি শাস্ত্রাভ্যাস — এই সকলকে বাচিক তপস্যা বলা হয়।

১৬

মনঃপ্রসাদঃ সৌম্যত্বং মৌনমাত্মবিনিগ্রহঃ।
ভাবসংশুদ্ধিরিত্যেতৎ তপো মানসমুচ্যতে।।১৬

অনুবাদ

মনের প্রসন্নভাব, সৌম্যভাব, মৌনভাব, ইন্দ্রিয়দমন, চিত্তের পরিচ্ছন্নতা — ইহাদের মানসিক তপস্যা বলা হয়।

১৭

শ্রদ্ধয়া পরয়া তপ্তং তপস্তৎ ত্রিবিধং নরৈঃ।
অফলাকাঙ্ক্ষিভির্যুক্তৈঃ সাত্ত্বিকং পরিচক্ষতে।।১৭

অনুবাদ

পূর্বোক্ত ত্রিবিধ তপস্যা যদি ফলাকাঙ্ক্ষাশূন্য, ঈশ্বরে একাগ্রচিত্ত ব্যক্তিগণ কর্তৃক পরম শ্রদ্ধাসহকারে অনুষ্ঠিত হয় — তবে তাহাকে সাত্ত্বিক তপস্যা বলে।

১৮

সৎকারমানপূজার্থং তপো দম্ভেন চৈব যৎ।
ক্রিয়তে তদিহ প্রোক্তং রাজসং চলমধ্রুবম্।।১৮

অনুবাদ

রাজস তপস্যা — সৎকার, মান ও পূজালাভের জন্য দম্ভ সহকারে যে তপস্যা অনুষ্ঠিত হয় এবং ইহলোকে যাহার ফল অনিত্য ও অনিশ্চিত।

১৯

মূঢ়গ্রাহেণাত্মনো যৎ পীড়য়া ক্রিয়তে তপঃ।
পরস্যোৎসাদনার্থং বা তৎ তামসমুদাহৃতম্।।১৯

অনুবাদ

তামস তপস্যা — মোহাচ্ছন্নবুদ্ধিবশে নিজের শরীরাদিকেও পীড়া দিয়া অথবা জারণ-মারণাদি অভিচার দ্বারা পরের বিনাশার্থ যে তপস্যা অনুষ্ঠিত হয় তাহাকেই বলে।

✦ ত্রিবিধ দান ✦
২০

দাতব্যমিতি যদ্দানং দীয়তেহনুপকারিণে।
দেশে কালে চ পাত্রে চ তদ্দানং সাত্ত্বিকং স্মৃতম্।।২০

অনুবাদ

'দান করা উচিত, তাই দান করি' — এই রকম কর্তব্যবুদ্ধিতে উপযুক্ত দেশ, কাল ও পাত্র বিবেচনা করিয়া অনুপকারী ব্যক্তিকে যে দান করা হয় তাহাকেই সাত্ত্বিক দান বলা হয়।

২১

যৎ তু প্রত্যুপকারার্থং ফলমুদ্দিশ্য বা পুনঃ।
দীয়তে চ পরিক্লিষ্টং তদ্দানং রাজসং স্মৃতম্।।২১

অনুবাদ

রাজস দান — প্রত্যুপকারের আশায় অথবা স্বর্গাদি ফলকামনায় অতি কষ্টের সহিত যে দান করা হয় তাহাকেই বলে।

২২

অদেশকালে যদ্দানমপাত্রেভ্যশ্চ দীয়তে।
অসৎকৃতমবজ্ঞাতং তৎ তামসমুদাহৃতম্।।২২

অনুবাদ

অনুপযুক্ত দেশে, অনুপযুক্ত কালে এবং অনুপযুক্ত পাত্রে যে দান করা হয় এবং সৎকারশূন্য ও অবজ্ঞাসহকারে কৃত যে দান — তাহাকে তামস দান বলে।

✦ ওঁ তৎ সৎ — ব্রহ্মের ত্রিবিধ নাম ✦
২৩

ওং তৎসদিতি নির্দেশো ব্রহ্মণস্ত্রিবিধঃ স্মৃতঃ।
ব্রাহ্মণাস্তেন বেদাশ্চ যজ্ঞাশ্চ বিহিতাঃ পুরা।।২৩

অনুবাদ

'ওঁ তৎ সৎ' — এই তিনরকম পরব্রহ্মের নাম নির্দেশ করা হইয়াছে। এই নির্দেশ হইতেই পূর্বকালে বেদবিদ্ ব্রাহ্মণ, বেদ ও যজ্ঞ সৃষ্টি হইয়াছে।

২৪

তস্মাদোমিত্যুদাহৃত্য যজ্ঞদানতপঃক্রিয়াঃ।
প্রবর্তন্তে বিধানোক্তাঃ সততং ব্রহ্মবাদিনাম্।।২৪

অনুবাদ

'ওঁ' উচ্চারণ করিয়া ব্রাহ্মবাদিগণের যজ্ঞ, দান ও তপস্যাদি শাস্ত্রোক্ত কর্ম সর্বদা অনুষ্ঠিত হয়।

২৫

তদিত্যনভিসন্ধায় ফলং যজ্ঞতপঃক্রিয়াঃ।
দানক্রিয়াশ্চ বিবিধাঃ ক্রিয়ন্তে মোক্ষকাঙ্ক্ষিভিঃ।।২৫

অনুবাদ

যাঁহারা মোক্ষকামনা করেন, তাঁহারা ফলকামনা ত্যাগ করিয়া 'তৎ' এই শব্দ উচ্চারণপূর্বক বিবিধ যজ্ঞ, তপস্যা এবং দানক্রিয়ার অনুষ্ঠান করেন।

২৬

সদ্ভাবে সাধুভাবে চ সদিত্যেতৎ প্রযুজ্যতে।
প্রশস্তে কর্মণি তথা সচ্ছব্দঃ পার্থ যুজ্যতে।।২৬

অনুবাদ

হে পার্থ, সদ্ভাব ও সাধুভাবে অর্থাৎ কোনো বস্তুর অস্তিত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব নির্দেশার্থ 'সৎ' শব্দ প্রযুক্ত হয় এবং মঙ্গলকর্মেও 'সৎ' শব্দ ব্যবহৃত হয়।

২৭

যজ্ঞে তপসি দানে চ স্থিতিঃ সদিতি চোচ্যতে।
কর্ম চৈব তদর্থীয়ং সদিত্যেবাভিধীয়তে।।২৭

অনুবাদ

যজ্ঞ, তপস্যা ও দানে নিষ্ঠা বা তৎপর হইয়া থাকাকেও 'সৎ' বলে এবং এই সকলের জন্য যে কিছু কর্ম করিতে হয় তাহাও 'সৎ' বলিয়া কথিত হয়।

✦ শ্রদ্ধাহীন কর্ম 'অসৎ' ✦
২৮

অশ্রদ্ধয়া হুতং দত্তং তপস্তপ্তং কৃতঞ্চ যৎ।
অসদিত্যুচ্যতে পার্থ ন চ তৎ প্রেত্য নো ইহ।।২৮

অনুবাদ

হে পার্থ, হোম, দান, তপস্যা বা অন্য কিছু যাহা অশ্রদ্ধাপূর্বক অনুষ্ঠিত হয় — সে সমুদয় 'অসৎ' বলিয়া কথিত হয়। সে সকল না ইহলোকে, না পরলোকে ফলদায়ক হয়।

🔥

ইতি শ্রদ্ধাত্রয়বিভাগযোগ নামক
সপ্তদশ অধ্যায় সমাপ্ত।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতোপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং
যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে
শ্রদ্ধাত্রয়বিভাগযোগো নাম সপ্তদশোহধ্যায়ঃ