🌅

ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা

অষ্টাদশ অধ্যায়

মোক্ষযোগ

Moksha Yoga

শ্লোক ৭৮

সন্ন্যাস ও ত্যাগের পার্থক্য, ত্রিবিধ জ্ঞান-কর্ম-কর্তা-বুদ্ধি-ধৃতি-সুখ।
স্বধর্মে নিষ্ঠা, ভক্তিতে ব্রহ্মলাভ — মোক্ষযোগের সারসংক্ষেপ।
সকল ধর্ম ত্যাগ করিয়া একমাত্র আমার শরণ লও।

↓ নিচে স্ক্রল করুন
অর্জুন উবাচ
✦ সন্ন্যাস ও ত্যাগের তত্ত্ব ✦

সন্ন্যাসস্য মহাবাহো তত্ত্বমিচ্ছামি বেদিতুম্।
ত্যাগস্য চ হৃষীকেশ পৃথক্ কেশিনিষূদন।।১

অনুবাদ

অর্জুন বলিলেন — হে মহাবাহো, হৃষীকেশ, কেশিনিসূদন, সন্ন্যাস ও ত্যাগের তত্ত্ব কি তাহা পৃথকভাবে জানিতে ইচ্ছা করি।

শ্রীভগবানুবাচ

কাম্যানাং কর্মণাং ন্যাসং সন্ন্যাসং কবয়ো বিদুঃ।
সর্বকর্মফলত্যাগং প্রাহুস্ত্যাগং বিচক্ষণাঃ।।২

অনুবাদ

শ্রীভগবান বলিলেন — কাম্যকর্মের ত্যাগকেই পণ্ডিতগণ সন্ন্যাস বলিয়া জানেন এবং সমস্ত কর্মের ফলত্যাগকেই সূক্ষ্মদর্শিগণ ত্যাগ বলিয়া থাকেন।

ত্যাজ্যং দোষবদিত্যেকে কর্ম প্রাহুর্মনীষিণঃ।
যজ্ঞদানতপঃকর্ম ন ত্যাজ্যমিতি চাপরে।।৩

অনুবাদ

কোনো কোনো পণ্ডিতগণ বলেন কর্মমাত্রই দোষযুক্ত অতএব ত্যাজ্য, অন্য কেহ কেহ বলেন যজ্ঞ, দান ও তপঃকর্ম ত্যাজ্য নহে।

নিশ্চয়ং শৃণু মে তত্র ত্যাগে ভরতসত্তম।
ত্যাগো হি পুরুষব্যাঘ্র ত্রিবিধঃ সম্প্রকীর্তিতঃ।।৪

অনুবাদ

হে ভরতশ্রেষ্ঠ, ত্যাগ বিষয়ে আমার সিদ্ধান্ত শ্রবণ করো। হে পুরুষশ্রেষ্ঠ, ত্যাগ ত্রিবিধ বলিয়া কথিত হইয়াছে।

যজ্ঞদানতপঃকর্ম ন ত্যাজ্যং কার্যমেব তৎ।
যজ্ঞো দানং তপশ্চৈব পাবনানি মনীষিণাম্।।৫

অনুবাদ

যজ্ঞ, দান ও তপস্যারূপ কর্ম ত্যাজ্য নহে, উহা করাই কর্তব্য। বিদ্বানগণের চিত্তশুদ্ধিকর যজ্ঞ, দান ও তপস্যা।

এতান্যপি তু কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা ফলানি চ।
কর্তব্যানীতি মে পার্থ নিশ্চিতং মতমুত্তমম্।।৬

অনুবাদ

হে পার্থ, এই সকল কর্মও কর্তৃত্বাভিমান ও ফলকামনা ত্যাগ করিয়া করা কর্তব্য। ইহাই উত্তম মত ও আমার নিশ্চিত মত।

✦ তিন প্রকার ত্যাগ ✦

নিয়তস্য তু সন্ন্যাসঃ কর্মণো নোপপদ্যতে।
মোহাৎ তস্য পরিত্যাগস্তামসঃ পরিকীর্তিতঃ।।৭

অনুবাদ

যাহার স্বধর্ম বলিয়া যে কর্ম নির্দিষ্ট আছে সেই কর্ম ত্যাগ করা কর্তব্য নহে — মোহবশতঃ সেই কর্ম ত্যাগ করাকে তামসত্যাগ বলে।

দুঃখমিত্যেব যৎ কর্ম কায়ক্লেশভয়াৎ ত্যজেৎ।
স কৃত্বা রাজসং ত্যাগং নৈব ত্যাগফলং লভেৎ।।৮

অনুবাদ

দুঃখকর মনে করিয়া কায়িক ক্লেশের ভয়ে যে কর্মত্যাগ করা হয় তাহা রাজসত্যাগ। এইভাবে কর্মত্যাগ করিলে প্রকৃত ত্যাগের ফল লাভ হয় না।

কার্যমিত্যেব যৎ কর্ম নিয়তং ক্রিয়তেহর্জুন।
সঙ্গং ত্যক্ত্বা ফলঞ্চৈব স ত্যাগঃ সাত্ত্বিকো মতঃ।।৯

অনুবাদ

হে অর্জুন, কর্তৃত্বাভিমান ও ফলকামনা ত্যাগ করিয়া কেবল কর্তব্য বলিয়া যে বিহিত কর্ম করা হয় — তাহাই সাত্ত্বিকত্যাগ বলিয়া মত।

১০

ন দ্বেষ্ট্যকুশলং কর্ম কুশলে নানুষজ্জতে।
ত্যাগী সত্ত্বসমাবিষ্টো মেধাবী ছিন্নসংশয়ঃ।।১০

অনুবাদ

সত্ত্বগুণসম্পন্ন মেধাবী ত্যাগী সংশয়মুক্ত হইয়া অকুশল কর্ম দ্বেষ করেন না, কুশল কর্মে আসক্তও হন না।

১১

ন হি দেহভৃতা শক্যং ত্যক্তুং কর্মাণ্যশেষতঃ।
যস্তু কর্মফলত্যাগী স ত্যাগীত্যভিধীয়তে।।১১

অনুবাদ

যে দেহ ধারণ করে তাহার পক্ষে কর্ম সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করা সম্ভব নয় — সুতরাং যিনি কর্মফল ত্যাগ করেন তিনিই প্রকৃত ত্যাগী বলিয়া কথিত হন।

১২

অনিষ্টমিষ্টং মিশ্রঞ্চ ত্রিবিধং কর্মণঃ ফলম্।
ভবত্যত্যাগিনাং প্রেত্য ন তু সন্ন্যাসিনাং ক্বচিৎ।।১২

অনুবাদ

ফলকামনা যাহারা ত্যাগ করেন না তাহাদের মৃত্যুর পরে অনিষ্ট, ইষ্ট ও মিশ্র — এই তিন প্রকার কর্মফল লাভ হয়। কিন্তু সন্ন্যাসীদের কখনও নহে।

✦ কর্মের পাঁচটি কারণ ✦
১৩

পঞ্চেমানি মহাবাহো কারণানি নিবোধ মে।
সাংখ্যে কৃতান্তে প্রোক্তানি সিদ্ধয়ে সর্বকর্মণাম্।।১৩

অনুবাদ

হে মহাবাহো, যে কোনো কর্ম সম্পাদনের পক্ষে পাঁচটি কারণ সাংখ্যসিদ্ধান্তে বর্ণিত আছে। তাহা আমার নিকট শ্রবণ করো।

১৪

অধিষ্ঠানং তথা কর্তা করণঞ্চ পৃথগ্বিধম্।
বিবিধাশ্চ পৃথক্ চেষ্টা দৈবঞ্চৈবাত্র পঞ্চমম্।।১৪

অনুবাদ

অধিষ্ঠান, কর্তা, বিবিধ করণ বা সাধন, কর্তার অনেক প্রকার চেষ্টা বা ব্যাপার এবং পঞ্চম কারণ দৈব।

১৫

শরীরবাঙ্মনোভির্যৎ কর্ম প্রারভতে নরঃ।
ন্যায্যং বা বিপরীতং বা পঞ্চৈতে তস্য হেতবঃ।।১৫

অনুবাদ

মনুষ্য শরীর, মন ও বাক্যদ্বারা ন্যায্য বা অন্যায্য যে কোনো কর্ম করে — পূর্বোক্ত পাঁচটি তাহার কারণ।

১৬

তত্রৈবং সতি কর্তারমাত্মানং কেবলং তু যঃ।
পশ্যত্যকৃতবুদ্ধিত্বান্ন স পশ্যতি দুর্মতিঃ।।১৬

অনুবাদ

এইরূপ হইলেও নিঃসঙ্গ আত্মাকে যে কর্তা বলিয়া মনে করে — তাহার বুদ্ধি শাস্ত্রজ্ঞানে পরিমার্জিত না হওয়ায় সে প্রকৃত তত্ত্ব দেখিতে পায় না।

১৭

যস্য নাহঙ্কৃতো ভাবো বুদ্ধির্যস্য ন লিপ্যতে।
হত্বাপি স ইমাঁল্লোকান্ন হন্তি ন নিবধ্যতে।।১৭

অনুবাদ

'আমি কর্তা' এই ভাব যাঁহার নাই, যাঁহার বুদ্ধি কর্মফলে আসক্ত নয় — তিনি সমস্ত লোক হনন করিলেও কিছুই হনন করেন না এবং তাহার ফলে আবদ্ধও হন না।

✦ ত্রিবিধ জ্ঞান ✦
১৮

জ্ঞানং জ্ঞেয়ং পরিজ্ঞাতা ত্রিবিধা কর্মচোদনা।
করণং কর্ম কর্তেতি ত্রিবিধঃ কর্মসংগ্রহঃ।।১৮

অনুবাদ

জ্ঞান, জ্ঞেয় ও পরিজ্ঞাতা — এই তিনটি কর্মপ্রবর্তক। করণ, কর্ম, কর্তা — এই তিনটি ক্রিয়ার আশ্রয়।

১৯

জ্ঞানং কর্ম চ কর্তা চ ত্রিধৈব গুণভেদতঃ।
প্রোচ্যতে গুণসংখ্যানে যথাবচ্ছৃণু তান্যপি।।১৯

অনুবাদ

সাংখ্যশাস্ত্রে জ্ঞান, কর্ম ও কর্তা গুণভেদে তিন প্রকার কথিত হইয়াছে — সে সকল যথাবৎ কহিতেছি, শ্রবণ করো।

২০

সর্বভূতেষু যেনৈকং ভাবমব্যয়মীক্ষতে।
অবিভক্তং বিভক্তেষু তজ্জ্ঞানং বিদ্ধি সাত্ত্বিকম্।।২০

অনুবাদ

যে জ্ঞানদ্বারা পরস্পর বিভক্তভাবে প্রতীয়মান সর্বভূতে এক অদ্বয় অব্যয় বস্তু পরিদৃষ্ট হয় — তাহাই সাত্ত্বিক জ্ঞান।

২১

পৃথক্ত্বেন তু যজ্জ্ঞানং নানাভাবান্ পৃথগ্বিধান্।
বেত্তি সর্বেষু ভূতেষু তজ্জ্ঞানং বিদ্ধি রাজসম্।।২১

অনুবাদ

ভিন্ন ভিন্ন ভূতসমূহে পৃথক পৃথক ভাবের অনুভূতি হয় যে জ্ঞানে — তাহা রাজস জ্ঞান।

২২

যৎ তু কৃৎস্নবদেকস্মিন্ কার্যে সক্তমহৈতুকম্।
অতত্ত্বার্থবদল্পঞ্চ তৎ তামসমুদাহৃতম্।।২২

অনুবাদ

যাহা প্রকৃত তত্ত্ব না বুঝিয়া, ইহাই যাহা কিছু সমস্ত, এইরূপ বুদ্ধিতে কোনো একমাত্র বিষয়ে আসক্ত থাকে — সেই যুক্তিবিরুদ্ধ অযথার্থ তুচ্ছ জ্ঞানকে তামস জ্ঞান কহে।

✦ ত্রিবিধ কর্ম ✦
২৩

নিয়তং সঙ্গরহিতমরাগদ্বেষতঃ কৃতম্।
অফলপ্রেপ্সুনা কর্ম যৎ তৎ সাত্ত্বিকমুচ্যতে।।২৩

অনুবাদ

ফলকামনা পরিত্যাগপূর্বক রাগদ্বেষ বর্জিত হইয়া অনাসক্তভাবে অবশ্যকর্তব্যরূপে বিহিত যে কর্ম করা হয় — তাহাই সাত্ত্বিক কর্ম।

২৪

যৎ তু কামেপ্সুনা কর্ম সাহঙ্কারেণ বা পুনঃ।
ক্রিয়তে বহুলায়াসং তদ্ রাজসমুদাহৃতম্।।২৪

অনুবাদ

ফলাকাঙ্ক্ষা করিয়া কিংবা অহঙ্কার সহকারে বহু আয়াস স্বীকার করিয়া যে কর্ম অনুষ্ঠিত হয় — তাহা রাজস কর্ম।

২৫

অনুবন্ধং ক্ষয়ং হিংসামনপেক্ষ্য চ পৌরুষম্।
মোহাদারভ্যতে কর্ম যৎ তৎ তামসমুচ্যতে।।২৫

অনুবাদ

ভাবিফল না ভাবিয়া, নিজের সামর্থ্য না বিচারিয়া, প্রাণীহিংসা হইবে কিনা ও পরিণামে কিরূপ হানি হইবে তাহা বিচার না করিয়া মোহবশতঃ যে কর্ম আরম্ভ করা হয় — তাহা তামস কর্ম।

✦ ত্রিবিধ কর্তা ✦
২৬

মুক্তসঙ্গোহনহংবাদী ধৃত্যুৎসাহসমন্বিতঃ।
সিদ্ধ্যসিদ্ধ্যোর্নির্বিকারঃ কর্তা সাত্ত্বিক উচ্যতে।।২৬

অনুবাদ

আসক্তিবর্জিত, অনহংবাদী, ধৈর্য ও উৎসাহসহকারে সিদ্ধি ও অসিদ্ধিতে হর্ষবিষাদশূন্য হইয়া নির্বিকার চিত্তে যিনি কর্ম করেন — তাহাকেই সাত্ত্বিক কর্তা বলে।

২৭

রাগী কর্মফলপ্রেপ্সুর্লুব্ধো হিংসাত্মকোহশুচিঃ।
হর্ষশোকান্বিতঃ কর্তা রাজসঃ পরিকীর্তিতঃ।।২৭

অনুবাদ

বিষয়াসক্ত, কর্মফলাকাঙ্ক্ষী, লোভী, হিংসাপরায়ণ, শৌচাচারহীন, সিদ্ধিলাভে হর্ষান্বিত ও অসিদ্ধিতে শোকান্বিত — এই রকম কর্তাকেই রাজস কর্তা বলে।

২৮

অযুক্তঃ প্রাকৃতঃ স্তব্ধঃ শঠো নৈষ্কৃতিকোহলসঃ।
বিষাদী দীর্ঘসূত্রী চ কর্তা তামস উচ্যতে।।২৮

অনুবাদ

অস্থিরমতি, অভদ্র, অনম্র, শঠ, পরবৃত্তিনাশক, অলস, সদা অবসন্নচিত্ত ও দীর্ঘসূত্রী — তাহাকে তামস কর্তা বলে।

✦ ত্রিবিধ বুদ্ধি ✦
২৯

বুদ্ধের্ভেদং ধৃতেশ্চৈব গুণতস্ত্রিবিধং শৃণু।
প্রোচ্যমানমশেষেণ পৃথক্ত্বেন ধনঞ্জয়।।২৯

অনুবাদ

হে ধনঞ্জয়, বুদ্ধির ও ধৃতির যে গুণানুসারে তিন প্রকার ভেদ হয় তাহা পৃথক পৃথক সুস্পষ্টরূপে বলিতেছি, শ্রবণ করো।

৩০

প্রবৃত্তিঞ্চ নিবৃত্তিঞ্চ কার্যাকার্যে ভয়াভয়ে।
বন্ধং মোক্ষঞ্চ যা বেত্তি বুদ্ধিঃ সা পার্থ সাত্ত্বিকী।।৩০

অনুবাদ

হে পার্থ, সাত্ত্বিকী বুদ্ধি তাহাই — যাহা কর্মে প্রবৃত্তি ও নিবৃত্তি, কর্তব্য-অকর্তব্য, ভয়-অভয়, বন্ধ ও মোক্ষ যথাযথরূপে বোঝায়।

৩১

যয়া ধর্মমধর্মঞ্চ কার্যঞ্চাকার্যমেব চ।
অযথাবৎ প্রজানাতি বুদ্ধিঃ সা পার্থ রাজসী।।৩১

অনুবাদ

হে পার্থ, যে বুদ্ধিদ্বারা ধর্ম ও অধর্ম, কার্য ও অকার্য যথাযথরূপে বোঝা যায় না — তাহা রাজসী বুদ্ধি।

৩২

অধর্মং ধর্মমিতি যা মন্যতে তমসাবৃতা।
সর্বার্থান্ বিপরীতাংশ্চ বুদ্ধিঃ সা পার্থ তামসী।।৩২

অনুবাদ

হে পার্থ, যে বুদ্ধি মোহাচ্ছন্ন থাকাতে অধর্মকে ধর্ম মনে করে এবং সকল বিষয় বিপরীত বোঝে — তাহাই তামসী বুদ্ধি।

✦ ত্রিবিধ ধৃতি ✦
৩৩

ধৃত্যা যয়া ধারয়তে মনঃপ্রাণেন্দ্রিয়ক্রিয়াঃ।
যোগেনাব্যভিচারিণ্যা ধৃতিঃ সা পার্থ সাত্ত্বিকী।।৩৩

অনুবাদ

যে অবিচলিত ধৃতিদ্বারা যোগবলে মন, প্রাণ ও ইন্দ্রিয়ের ক্রিয়া নিয়মিত হয় — তাহাই সাত্ত্বিকী ধৃতি।

৩৪

যয়া তু ধর্মকামার্থান্ ধৃত্যা ধারয়তেহর্জুন।
প্রসঙ্গেন ফলাকাঙ্ক্ষী ধৃতিঃ সা পার্থ রাজসী।।৩৪

অনুবাদ

হে পার্থ, যে ধৃতিদ্বারা মনুষ্য ধর্ম, অর্থ ও কামোপভোগেই লাগিয়া থাকে এবং ফলাকাঙ্ক্ষী হয় — তাহাই রাজসী ধৃতি।

৩৫

যয়া স্বপ্নং ভয়ং শোকং বিষাদং মদমেব চ।
ন বিমুঞ্চতি দুর্মেধা ধৃতিঃ সা পার্থ তামসী।।৩৫

অনুবাদ

হে পার্থ, যে ধৃতিদ্বারা দুর্বুদ্ধি ব্যক্তি নিদ্রা, ভয়, শোক, বিষাদ এবং মদ ছাড়িতে পারে না — তাহা তামসী ধৃতি।

✦ ত্রিবিধ সুখ ✦
৩৬

সুখং ত্বিদানীং ত্রিবিধং শৃণু মে ভরতর্ষভ।
অভ্যাসাদ্ রমতে যত্র দুঃখান্তঞ্চ নিগচ্ছতি।।৩৬

অনুবাদ

হে ভরতর্ষভ, এখন আমার নিকট ত্রিবিধ সুখের বিষয় শ্রবণ করো — যে সুখে অভ্যাসবশতঃ ক্রমে ক্রমে আনন্দলাভ হয় এবং যাহাতে দুঃখের অন্ত হয়।

৩৭

যৎ তদগ্রে বিষমিব পরিণামেহমৃতোপমম্।
তৎ সুখং সাত্ত্বিকং প্রোক্তমাত্মবুদ্ধিপ্রসাদজম্।।৩৭

অনুবাদ

যাহা আগে বিষের মতো, পরিণামে অমৃততুল্য এবং আত্মনিষ্ঠ বুদ্ধির প্রসন্নতা হইতে জন্মে — তাহাই সাত্ত্বিক সুখ।

৩৮

বিষয়েন্দ্রিয়সংযোগাদ্ যৎ তদগ্রেহমৃতোপমম্।
পরিণামে বিষমিব তৎ সুখং রাজসং স্মৃতম্।।৩৮

অনুবাদ

বিষয়ে ইন্দ্রিয়ের সংযোগে যে সুখ উৎপন্ন হয় এবং যাহা আগে অমৃতের মতো কিন্তু পরিণামে বিষতুল্য — তাহাকে রাজস সুখ বলে।

৩৯

যদগ্রে চানুবন্ধে চ সুখং মোহনমাত্মনঃ।
নিদ্রালস্যপ্রমাদোত্থং তৎ তামসমুদাহৃতম্।।৩৯

অনুবাদ

যাহা প্রথমে এবং পরিণামেও আত্মার মোহজনক এবং যাহা নিদ্রা, আলস্য ও কর্তব্যবিস্মৃতি হইতে উৎপন্ন হয় — তাহাকেই তামস সুখ বলে।

✦ বর্ণাশ্রমের স্বধর্ম ✦
৪০

ন তদস্তি পৃথিব্যাং বা দিবি দেবেষু বা পুনঃ।
সত্ত্বং প্রকৃতিজৈর্মুক্তং যদেভিঃ স্যাৎ ত্রিভির্গুণৈঃ।।৪০

অনুবাদ

পৃথিবীতে, স্বর্গে অথবা দেবগণের মধ্যেও এমন প্রাণী বা বস্তু নাই যাহা প্রকৃতিজাত সত্ত্বাদি তিন গুণ হইতে মুক্ত।

৪১

ব্রাহ্মণক্ষত্রিয়বিশাং শূদ্রাণাঞ্চ পরন্তপ।
কর্মাণি প্রবিভক্তানি স্বভাবপ্রভবৈর্গুণৈঃ।।৪১

অনুবাদ

কর্মসকল স্বভাবজাত গুণানুসারে পৃথক পৃথক বিভক্ত হইয়াছে — ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রদিগের।

৪২

শমো দমস্তপঃ শৌচং ক্ষান্তিরার্জবমেব চ।
জ্ঞানং বিজ্ঞানমাস্তিক্যং ব্রহ্মকর্ম স্বভাবজম্।।৪২

অনুবাদ

শম, দম, তপঃ, শৌচ, ক্ষমা, সরলতা, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও আস্তিক্য — এই সকল ব্রাহ্মণের স্বভাবজাত কর্ম।

৪৩

শৌর্যং তেজো ধৃতির্দাক্ষ্যং যুদ্ধে চাপ্যপলায়নম্।
দানমীশ্বরভাবশ্চ ক্ষাত্রং কর্ম স্বভাবজম্।।৪৩

অনুবাদ

পরাক্রম, তেজ, ধৈর্য, কার্যকুশলতা, যুদ্ধে অপরাজুখতা, দানে মুক্তহস্ততা ও শাসনক্ষমতা — এই গুলি ক্ষত্রিয়ের স্বভাবজাত কর্ম।

৪৪

কৃষিগৌরক্ষ্যবাণিজ্যং বৈশ্যকর্ম স্বভাবজম্।
পরিচর্যাত্মকং কর্ম শূদ্রস্যাপি স্বভাবজম্।।৪৪

অনুবাদ

বৈশ্যদিগের কৃষি, গোরক্ষ ও বাণিজ্য স্বভাবজাত কর্ম এবং শূদ্রদিগের সেবাত্মক কর্মও স্বভাবজাত।

৪৫

স্বে স্বে কর্মণ্যভিরতঃ সংসিদ্ধিং লভতে নরঃ।
স্বকর্মনিরতঃ সিদ্ধিং যথা বিন্দতি তচ্ছৃণু।।৪৫

অনুবাদ

নিষ্ঠাবান ব্যক্তি নিজের নিজের কর্মে সিদ্ধিলাভ করে। স্বকর্মে তৎপর থাকিলে কিরূপে মনুষ্য সিদ্ধিলাভ করে তাহা শ্রবণ করো।

৪৬

যতঃ প্রবৃত্তির্ভূতানাং যেন সর্বমিদং ততম্।
স্বকর্মণা তমভ্যর্চ্য সিদ্ধিং বিন্দতি মানবঃ।।৪৬

অনুবাদ

ভূতসমূহের উৎপত্তি যাঁহা হইতে, যিনি এই চরাচর ব্রহ্মাণ্ড ব্যাপিয়া আছেন — মানব নিজকর্মদ্বারা তাঁহার অর্চনা করিয়া সিদ্ধিলাভ করে।

৪৭

শ্রেয়ান্ স্বধর্মো বিগুণঃ পরধর্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ।
স্বভাবনিয়তং কর্ম কুর্বন্নাপ্নোতি কিল্বিষম্।।৪৭

অনুবাদ

স্বধর্ম দোষবিশিষ্ট হইলেও সম্যক অনুষ্ঠিত পরধর্ম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। স্বভাবনির্দিষ্ট কর্ম করিয়া লোক পাপভাগী হয় না।

৪৮

সহজং কর্ম কৌন্তেয় সদোষমপি ন ত্যজেৎ।
সর্বারম্ভা হি দোষেণ ধূমেনাগ্নিরিবাবৃতাঃ।।৪৮

অনুবাদ

হে কৌন্তেয়, স্বভাবজ কর্ম দোষযুক্ত হইলেও তাহা ত্যাগ করিতে নাই। ধূম দ্বারা আবৃত থাকে অগ্নি যেমন — তদ্রূপ কর্মমাত্রই কোনো না কোনো দোষে আবৃত।

✦ সন্ন্যাসে ব্রহ্মভাব ✦
৪৯

অসক্তবুদ্ধিঃ সর্বত্র জিতাত্মা বিগতস্পৃহঃ।
নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধিং পরমাং সন্ন্যাসেনাধিগচ্ছতি।।৪৯

অনুবাদ

সর্ববিষয়ে অনাসক্ত, জিতেন্দ্রিয় ও নিস্পৃহ যিনি — তিনি কর্মফলত্যাগের দ্বারা পরম নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি লাভ করেন।

৫০

সিদ্ধিং প্রাপ্তো যথা ব্রহ্ম তথাপ্নোতি নিবোধ মে।
সমাসেনৈব কৌন্তেয় নিষ্ঠা জ্ঞানস্য যা পরা।।৫০

অনুবাদ

হে কৌন্তেয়, নৈষ্কর্ম্যসিদ্ধি প্রাপ্ত ব্যক্তি যে প্রকারে ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হন তাহা আমার কাছে শ্রবণ করো। চরম অবস্থা উহাই জ্ঞানের।

৫১

বুদ্ধ্যা বিশুদ্ধয়া যুক্তো ধৃত্যাত্মানং নিয়ম্য চ।
শব্দাদীন্ বিষয়াংস্ত্যক্ত্বা রাগদ্বেষৌ ব্যুদস্য চ।।৫১

অনুবাদ

বিশুদ্ধ সাত্ত্বিক বুদ্ধিযুক্ত হইয়া, ধৈর্যসহ আত্মসংযমন করিয়া, শব্দাদি বিষয়সমূহ ত্যাগ করিয়া, রাগদ্বেষ বর্জন করিয়া।

৫২

বিবিক্তসেবী লঘ্বাশী যতবাক্কায়মানসঃ।
ধ্যানযোগপরো নিত্যং বৈরাগ্যং সমুপাশ্রিতঃ।।৫২

অনুবাদ

নির্জন স্থানে অবস্থান করিয়া, মিতভোজী হইয়া, বাক্য-শরীর ও মনকে সংযত করিয়া, বৈরাগ্য অবলম্বন করিয়া সর্বদা ধ্যানে নিরত থাকিয়া।

৫৩

অহঙ্কারং বলং দর্পং কামং ক্রোধং পরিগ্রহম্।
বিমুচ্য নির্মমঃ শান্তো ব্রহ্মভূয়ায় কল্পতে।।৫৩

অনুবাদ

অহঙ্কার, বল, দর্প, কাম, ক্রোধ ও বাহ্য ভোগসাধনার্থ প্রাপ্ত দ্রব্যাদি বর্জন করিয়া মমত্ববুদ্ধিহীন প্রশান্তচিত্ত সাধক ব্রহ্মভাবলাভে সমর্থ হন।

৫৪

ব্রহ্মভূতঃ প্রসন্নাত্মা ন শোচতি ন কাঙ্ক্ষতি।
সমঃ সর্বেষু ভূতেষু মদ্ভক্তিং লভতে পরাম্।।৫৪

অনুবাদ

ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হইয়া প্রসন্নচিত্তে শোক করেন না, আকাঙ্ক্ষাও করেন না — তিনি সর্বভূতে সমদর্শী হন ও আমাতে পরা ভক্তিলাভ করেন।

✦ ভক্তিতে পরমপুরুষ লাভ ✦
৫৫

ভক্ত্যা মামভিজানাতি যাবান্ যশ্চাস্মি তত্ত্বতঃ।
ততো মাং তত্ত্বতো জ্ঞাত্বা বিশতে তদনন্তরম্।।৫৫

অনুবাদ

এইরূপ পরাভক্তি দ্বারা আমাকে স্বরূপতঃ জানিতে পারেন — আমি কে, আমার বিভব কত, আমার সমগ্র স্বরূপ কি — এইরূপ আমাকে জানিয়া তদনন্তর আমাতে প্রবেশ করেন।

৫৬

সর্বকর্মাণ্যপি সদা কুর্বাণো মদ্ব্যপাশ্রয়ঃ।
মৎপ্রসাদাদবাপ্নোতি শাশ্বতং পদমব্যয়ম্।।৫৬

অনুবাদ

আমার আশ্রয় করিয়া সর্বদা সর্বকর্ম করিতে থাকিলেও আমার প্রসাদে শাশ্বত অব্যয় পদ প্রাপ্ত হন।

৫৭

চেতসা সর্বকর্মাণি ময়ি সংন্যস্য মৎপরঃ।
বুদ্ধিযোগমুপাশ্রিত্য মচ্চিত্তঃ সততং ভব।।৫৭

অনুবাদ

মনে মনে সমস্ত কর্ম আমাতে সমর্পণ করিয়া, মৎপরায়ণ হইয়া, সাম্যবুদ্ধিরূপ যোগ অবলম্বন করিয়া সর্বদা আমাতে চিত্ত রাখো।

৫৮

মচ্চিত্তঃ সর্বদুর্গাণি মৎপ্রসাদাৎ তরিষ্যসি।
অথ চেৎ ত্বমহঙ্কারান্ন শ্রোষ্যসি বিনঙ্ক্ষ্যসি।।৫৮

অনুবাদ

আমাতে চিত্ত রাখিলে তুমি আমার অনুগ্রহে সমস্ত সঙ্কট অতিক্রম করিবে। আর যদি আমার কথা না শুন তবে বিনাশ প্রাপ্ত হইবে।

✦ ঈশ্বরের শরণ ✦
৫৯

যদহঙ্কারমাশ্রিত্য ন যোৎস্য ইতি মন্যসে।
মিথ্যৈষ ব্যবসায়স্তে প্রকৃতিস্ত্বাং নিযোক্ষ্যতি।।৫৯

অনুবাদ

অহঙ্কার আশ্রয় করিয়া 'যুদ্ধ করিব না' এইরূপ যাহা মনে করিয়াছ — তাহা ভুল। তোমাকে ক্ষাত্র স্বভাবই যুদ্ধে নিযুক্ত করিবে।

৬০

স্বভাবজেন কৌন্তেয় নিবদ্ধঃ স্বেন কর্মণা।
কর্তুং নেচ্ছসি যন্মোহাৎ করিষ্যস্যবশোহপি তৎ।।৬০

অনুবাদ

হে কৌন্তেয়, মোহবশতঃ তুমি যাহা করিতে ইচ্ছা করিতেছ না — স্বভাবজ স্বীয় কর্মে আবদ্ধ থাকায় তোমাকে অবশ্যই তাহা করিতে হইবে।

৬১

ঈশ্বরঃ সর্বভূতানাং হৃদ্দেশেহর্জুন তিষ্ঠতি।
ভ্রামায়ন্ সর্বভূতানি যন্ত্রারূঢ়ানি মায়য়া।।৬১

অনুবাদ

সবার হৃদয়ে অধিষ্ঠিত থাকিয়া ঈশ্বর মায়াদ্বারা যন্ত্রারূঢ় পুত্তলিকার মতো তাহাদিগকে ভ্রমণ করাইতেছেন।

৬২

তমেব শরণং গচ্ছ সর্বভাবেন ভারত।
তৎপ্রসাদাৎ পরাং শান্তিং স্থানং প্রাপ্স্যসি শাশ্বতম্।।৬২

অনুবাদ

হে ভারত, সর্বতোভাবে তাঁহারই শরণ লও। তাঁহার প্রসাদে পরম শান্তি ও চিরন্তন স্থান প্রাপ্ত হইবে।

✦ গীতার গুহ্যতম বচন ✦
৬৩

ইতি তে জ্ঞানমাখ্যাতং গুহ্যাদ্ গুহ্যতরং ময়া।
বিমৃশ্যৈতদশেষেণ যথেচ্ছসি তথা কুরু।।৬৩

অনুবাদ

তোমার কাছে আমি গুহ্য হইতেও গুহ্যতর তত্ত্বকথা ব্যাখ্যা করিলাম। ইহা বিশেষভাবে পর্যালোচনা করিয়া যাহা ইচ্ছা হয় তাহা করো।

৬৪

সর্বগুহ্যতমং ভূয়ঃ শৃণু মে পরমং বচঃ।
ইষ্টোহসি মে দৃঢ়মিতি ততো বক্ষ্যামি তে হিতম্।।৬৪

অনুবাদ

এখন সর্বাপেক্ষা গুহ্যতম পরমশ্রেয়সাধন আমার কথা শ্রবণ করো। তুমি আমার অত্যন্ত প্রিয় — এই হেতু তোমাকে এই কল্যাণকর কথা বলিতেছি।

৬৫

মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্যাজী মাং নমস্কুরু।
মামেবৈষ্যসি সত্যং তে প্রতিজানে প্রিয়োহসি মে।।৬৫

অনুবাদ

আমাতেই একমাত্র চিত্ত রাখো, আমাকে ভক্তি করো, পূজা করো, নমস্কার করো। আমি সত্য প্রতিজ্ঞাপূর্বক বলিতেছি তুমি পাইবে আমাকেই — কারণ আমার প্রিয় তুমি।

✦ চরম উপদেশ — সর্বধর্ম পরিত্যাগ ✦
৬৬

সর্বধর্মান্ পরিত্যজ্য মামেকং শরণং ব্রজ।
অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যো মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ।।৬৬

অনুবাদ

সকল ধর্মাধর্ম পরিত্যাগপূর্বক একমাত্র আমার শরণাগত হও। আমি তোমাকে সকল পাপ হইতে মুক্ত করিব — শোক করিও না।

৬৭

ইদং তে নাতপস্কায় নাভক্তায় কদাচন।
ন চাশুশ্রূষবে বাচ্যং ন চ মাং যোহভ্যসূয়তি।।৬৭

অনুবাদ

তপস্যা বা স্বধর্মানুষ্ঠান যে করে না, যে অভক্ত, যে শুনিবার ইচ্ছা রাখে না এবং যে আমাকে নিন্দা করে — এইরূপ ব্যক্তিকে গীতাশাস্ত্র বলিবে না।

৬৮

য ইদং পরমং গুহ্যং মদ্ভক্তেষ্বভিধাস্যতি।
ভক্তিং ময়ি পরাং কৃত্বা মামেবৈষ্যত্যসংশয়ঃ।।৬৮

অনুবাদ

এই পরম গুহ্য শাস্ত্র আমার ভক্তগণের নিকট ব্যাখ্যা করিবেন — তিনি আমাকে পরাভক্তি করায় আমাকেই প্রাপ্ত হইবেন, সন্দেহ নাই।

৬৯

ন চ তস্মান্মনুষ্যেষু কশ্চিন্মে প্রিয়কৃত্তমঃ।
ভবিতা ন চ মে তস্মাদন্যঃ প্রিয়তরো ভুবি।।৬৯

অনুবাদ

মনুষ্যমধ্যে গীতাব্যাখ্যাতা অপেক্ষা আমার অধিক প্রিয়কারী আর কেহ নাই এবং পৃথিবীতে তাহা অপেক্ষা আমার অধিক প্রিয় আর কেহ হইবেও না।

৭০

অধ্যেষ্যতে চ য ইমং ধর্ম্যং সংবাদমাবয়োঃ।
জ্ঞানযজ্ঞেন তেনাহমিষ্টঃ স্যামিতি মে মতিঃ।।৭০

অনুবাদ

যিনি আমাদের এই ধর্মসংবাদ অধ্যয়ন করিবেন — তিনি জ্ঞানযজ্ঞ দ্বারা আমার অর্চনা করিলেন, ইহাই মনে করিব আমি।

৭১

শ্রদ্ধাবাননসূয়শ্চ শৃণুয়াদপি যো নরঃ।
সোহপি মুক্তঃ শুভাঁল্লোকান্ প্রাপ্নুয়াৎ পুণ্যকর্মণাম্।।৭১

অনুবাদ

শ্রদ্ধাবান ও অসূয়শূন্য হইয়া যিনি শ্রবণ করেন — তিনি পাপ হইতে বিমুক্ত হইয়া পুণ্যবানগণের প্রাপ্য শুভ লোকসকল প্রাপ্ত হন।

৭২

কচ্চিদেতচ্ছ্রুতং পার্থ ত্বয়ৈকাগ্রেণ চেতসা।
কচ্চিদজ্ঞানসম্মোহঃ প্রনষ্টস্তে ধনঞ্জয়।।৭২

অনুবাদ

তুমি একাগ্রমনে শুনিয়াছ তো ইহা? হে ধনঞ্জয়, তোমার অজ্ঞানজনিত মোহ দূর হইয়াছে তো?

অর্জুন উবাচ
✦ অর্জুনের মোহনাশ ✦
৭৩

নষ্টো মোহঃ স্মৃতিলব্ধা ত্বৎপ্রসাদান্ময়াচ্যুত।
স্থিতোহস্মি গতসন্দেহঃ করিষ্যে বচনং তব।।৭৩

অনুবাদ

অর্জুন বলিলেন — হে অচ্যুত, তোমার প্রসাদে আমার মোহ নষ্ট হইয়াছে, কর্তব্যাকর্তব্য জ্ঞানলাভ হইল। আমি স্থির হইয়াছি, আমার আর সংশয় নাই — আমি তোমার উপদেশ মতো কার্য করিব।

সঞ্জয় উবাচ
✦ সঞ্জয়ের উপসংহার ✦
৭৪

ইত্যহং বাসুদেবস্য পার্থস্য চ মহাত্মনঃ।
সংবাদমিমমশ্রৌষমদ্ভুতং রোমহর্ষণম্।।৭৪

অনুবাদ

সঞ্জয় কহিলেন — এইরূপে মহাত্মা বাসুদেব ও অর্জুনের এই অদ্ভুত লোমহর্ষকর সংবাদ আমি শ্রবণ করিয়াছি।

৭৫

ব্যাসপ্রসাদাচ্ছ্রুতবানেতদ্ গুহ্যমহং পরম্।
যোগং যোগেশ্বরাৎ কৃষ্ণাৎ সাক্ষাৎ কথয়তঃ স্বয়ম্।।৭৫

অনুবাদ

ব্যাসদেবের প্রসাদে সাক্ষাৎ যোগেশ্বর স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের মুখ হইতে আমি এই পরম গুহ্য যোগশাস্ত্র শ্রবণ করিয়াছি।

৭৬

রাজন্ সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য সংবাদমিমমদ্ভুতম্।
কেশবার্জুনয়োঃ পুণ্যং হৃষ্যামি চ মুহুর্মুহুঃ।।৭৬

অনুবাদ

হে রাজন, পবিত্র অদ্ভুত কেশব ও অর্জুনের সংবাদ বারংবার স্মরণ করিয়া মুহুর্মুহুঃ হর্ষ হইতেছে।

৭৭

তচ্চ সংস্মৃত্য সংস্মৃত্য রূপমত্যদ্ভুতং হরেঃ।
বিস্ময়ো মে মহান্ রাজন্ হৃষ্যামি চ পুনঃ পুনঃ।।৭৭

অনুবাদ

হে রাজন, অদ্ভুত সেই হরির বিশ্বরূপ স্মরণ করিয়া আমার অতিশয় বিস্ময় জন্মিতেছে এবং বারবার হর্ষ হইতেছে।

৭৮

যত্র যোগেশ্বরঃ কৃষ্ণো যত্র পার্থো ধনুর্ধরঃ।
তত্র শ্রীর্বিজয়ো ভূতির্ধ্রুবা নীতির্মতির্মম।।৭৮

অনুবাদ

যে পক্ষে যোগেশ্বর কৃষ্ণ এবং যেখানে ধনুর্ধর পার্থ — সেখানেই লক্ষ্মী, বিজয়, উত্তরোত্তর ঐশ্বর্যবৃদ্ধি ও অখণ্ডিত রাজনীতি আছে — আমার মত ইহাই।

🌅

ইতি মোক্ষযোগ নামক
অষ্টাদশ অধ্যায় সমাপ্ত।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতোপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং
যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে
মোক্ষযোগো নাম অষ্টাদশোহধ্যায়ঃ

🙏 ইতি শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা সমাপ্তা 🙏