জ্যায়সী চেৎ কর্মণস্তে মতা বুদ্ধির্জনার্দন।
তৎ কিং কর্মণি ঘোরে মাং নিয়োজয়সি কেশব।।১
অনুবাদ
অর্জুন বলিলেন — হে জনার্দন, যদি তোমার মতে কর্ম হইতে বুদ্ধি শ্রেষ্ঠ, তবে হে কেশব, আমাকে এই হিংসাত্মক ঘোর কর্মে কেন নিযুক্ত করিতেছ?
ব্যামিশ্রেণেব বাক্যেন বুদ্ধিং মোহয়সীব মে।
তদেকং বদ নিশ্চিত্য যেন শ্রেয়োহহমাপ্নুয়াম্।।২
অনুবাদ
বিমিশ্র বাক্য দ্বারা কেন আমার মনকে মোহিত করিতেছ? যাহা দ্বারা আমি শ্রেয় লাভ করিতে পারি, সেই একটি আমাকে নিশ্চিত করিয়া বল।
লোকেহস্মিন্ দ্বিবিধা নিষ্ঠা পুরা প্রোক্তা ময়ানঘ।
জ্ঞানযোগেন সাংখ্যানাং কর্মযোগেন যোগিনাম্।।৩
অনুবাদ
শ্রীভগবান বলিলেন — হে অনঘ, ইহলোকে দ্বিবিধ নিষ্ঠা আছে — ইহা পূর্বে বলিয়াছি। সাংখ্যদিগের জন্য জ্ঞানযোগ এবং কর্মীদিগের জন্য কর্মযোগ।
ন কর্মণামনারম্ভান্নৈষ্কর্য্যং পুরুষোহশ্নুতে।
ন চ সংন্যসনাদেব সিদ্ধিং সমধিগচ্ছতি।।৪
অনুবাদ
পুরুষ নৈষ্কর্য্যলাভ করিতে পারে না কর্মচেষ্টা না করিলেই। আর কর্মত্যাগ করিলেই সিদ্ধিলাভ হয় না।
ন হি কশ্চিৎ ক্ষণমপি জাতু তিষ্ঠত্যকর্মকৃৎ।
কার্যতে হ্যবশঃ কর্ম সর্বঃ প্রকৃতিজৈর্গুণৈঃ।।৫
অনুবাদ
ক্ষণকালও কর্ম না করিয়া কেহই থাকিতে পারে না। কেননা, প্রকৃতির গুণে অবশ হইয়া সকলেই কর্ম করিতে বাধ্য হয়।
কর্মেন্দ্রিয়াণি সংযম্য য আস্তে মনসা স্মরন্।
ইন্দ্রিয়ার্থান্ বিমূঢ়াত্মা মিথ্যাচারঃ স উচ্যতে।।৬
অনুবাদ
যে ভ্রান্তমতি হস্তপদাদি কর্মেন্দ্রিয়সকল সংযত করিয়া অবস্থিতি করে, অথচ মনে মনে ইন্দ্রিয়বিষয়সকল স্মরণ করে — সে মিথ্যাচারী।
যস্তিন্দ্রিয়াণি মনসা নিয়ম্যারভতেহর্জুন।
কর্মেন্দ্রিয়ৈঃ কর্মযোগমসক্তঃ স বিশিষ্যতে।।৭
অনুবাদ
যিনি মনের দ্বারা জ্ঞানেন্দ্রিয়সকল সংযত করিয়া অনাসক্ত হইয়া কর্মেন্দ্রিয়ের দ্বারা কর্মযোগের অনুষ্ঠান আরম্ভ করেন — তিনিই শ্রেষ্ঠ।
নিয়তং কুরু কর্ম ত্বং কর্ম জ্যায়ো হ্যকর্মণঃ।
শরীরযাত্রাপি চ তে ন প্রসিদ্ধ্যেদকর্মণঃ।।৮
অনুবাদ
নিয়ত কর্ম কর তুমি — কর্মশূন্যতা অপেক্ষা কর্ম শ্রেষ্ঠ। কর্ম না করিলে তোমার দেহযাত্রাও নির্বাহ হইতে পারে না।
যজ্ঞার্থাৎ কর্মণোহন্যত্র লোকোহয়ং কর্মবন্ধনঃ।
তদর্থং কর্ম কৌন্তেয় মুক্তসঙ্গঃ সমাচর।।৯
অনুবাদ
যজ্ঞার্থ সেই কর্ম তদ্ভিন্ন অন্য কর্ম মনুষ্যের বন্ধনের কারণ। হে কৌন্তেয়, তুমি সেই উদ্দেশ্যে অনাসক্ত হইয়া কর্ম কর।
সহযজ্ঞাঃ প্রজাঃ সৃষ্টা পুরোবাচ প্রজাপতিঃ।
অনেন প্রসবিষ্যধ্বমেষ বোহত্ত্বিষ্টকামধুক্।।১০
অনুবাদ
সৃষ্টির প্রারম্ভে প্রজাপতি যজ্ঞের সহিত প্রজাগণ সৃষ্টি করিয়া বলিয়াছিলেন — তোমরা এই যজ্ঞদ্বারা উত্তরোত্তর বর্ধিত হও। এই যজ্ঞ তোমাদের অভীষ্টপ্রদ হউক।
দেবান্ ভাবয়তানেন তে দেবা ভাবয়ন্তু বঃ।
পরস্পরং ভাবয়ন্তঃ শ্রেয়ঃ পরমবাপ্স্যথ।।১১
অনুবাদ
তোমরা দেবগণকে এই যজ্ঞদ্বারা সংবর্ধনা কর, সেই দেবগণও তোমাদিগকে সংবর্ধিত করুন। এইরকম পরস্পরের সংবর্ধনা দ্বারা পরম মঙ্গল লাভ করিবে।
ইষ্টান্ ভোগান্ হি বো দেবা দাস্যন্তে যজ্ঞভাবিতাঃ।
তৈর্দত্তানপ্রদায়ৈভ্যো যো ভুক্তে স্তেন এব সঃ।।১২
অনুবাদ
যজ্ঞাদি দ্বারা দেবগণ সংবর্ধিত হইয়া তোমাদিগকে অভীষ্ট ভোগ্যবস্তু প্রদান করিবেন। তাহাদিগকে না দিয়া সে ভোগ যে করে সে নিশ্চয়ই চোর।
যজ্ঞশিষ্টাশিনঃ সন্তো মুচ্যন্তে সর্বকিল্বিষৈঃ।
ভুঞ্জতে তে ত্বঘং পাপা যে পচন্ত্যাত্মকারণাৎ।।১৩
অনুবাদ
যজ্ঞাবশেষ অন্ন যাঁহারা ভোজন করেন — সেই সজ্জনগণ অর্থাৎ দেবতা অতিথি প্রভৃতিকে অন্নাদি প্রদান করিয়া অবশিষ্ট ভোজন করেন — তাঁহারা সর্বপাপ হইতে মুক্ত হন। কিন্তু যে পাপাত্মারা কেবল আপন উদরপূরণার্থ অন্ন পাক করে, তাহারা পাপরাশিই ভোজন করে।
অন্নাদ্ভবন্তি ভূতানি পর্জন্যাদন্নসম্ভবঃ।
যজ্ঞাদ্ভবতি পর্জন্যো যজ্ঞঃ কর্মসমুদ্ভবঃ।।১৪
অনুবাদ
প্রাণীসকল অন্ন হইতে উৎপন্ন হয়, মেঘ হইতে অন্ন উৎপন্ন হয়, যজ্ঞ হইতে মেঘ জন্মে, কর্ম যজ্ঞ হইতে উৎপন্ন হয়।
কর্ম ব্রহ্মোদ্ভবং বিদ্ধি ব্রহ্মাক্ষরসমুদ্ভবম্।
তস্মাৎ সর্বগতং ব্রহ্ম নিত্যং যজ্ঞে প্রতিষ্ঠিতম্।।১৫
অনুবাদ
কর্ম বেদ হইতে উৎপন্ন জানিও এবং বেদ পরব্রহ্ম হইতে উৎপন্ন। সেই হেতু সর্বব্যাপী পরব্রহ্ম সদা যজ্ঞে প্রতিষ্ঠিত আছেন।
এবং প্রবর্তিতং চক্রং নানুবর্তয়তীহ যঃ।
অঘায়ুরিন্দ্রিয়ারামো মোঘং পার্থ স জীবতি।।১৬
অনুবাদ
এইরূপ প্রবর্তিত জগচক্রের যে অনুবর্তন না করে, সে ইন্দ্রিয়সুখাসক্ত ও পাপজীবন। হে পার্থ, সে জীবন ধারণ করে বৃথা।
যত্ত্বাত্মরতিরেব স্যাদাত্মতৃপ্তশ্চ মানবঃ।
আত্মন্যেব চ সন্তুষ্টস্তস্য কার্যং ন বিদ্যতে।।১৭
অনুবাদ
আত্মাতেই যিনি কেবল প্রীত, যিনি আত্মাতেই তৃপ্ত, যিনি কেবল আত্মাতেই সন্তুষ্ট থাকেন — তাঁহার নিজের কোনো প্রকার কর্তব্য নাই।
নৈব তস্য কৃতেনার্থো নাকৃতেনেহ কশ্চন।
ন চাস্য সর্বভূতেষু কশ্চিদর্থব্যপাশ্রয়ঃ।।১৮
অনুবাদ
আত্মারামের কর্মানুষ্ঠানে কোনো প্রয়োজন নাই, কর্ম হইতে বিরত থাকারও কোনো প্রয়োজন নাই। সর্বভূতের মধ্যে কাহারও আশ্রয়ে তাঁহার প্রয়োজন নাই।
তস্মাদসক্তঃ সততং কার্যং কর্ম সমাচর।
অসক্তো হ্যাচরন্ কর্ম পরমাপ্নোতি পুরুষঃ।।১৯
অনুবাদ
অতএব তুমি আসক্তিশূন্য হইয়া সর্বদা কর্তব্যকর্ম সম্পাদন কর। কারণ অনাসক্ত হইয়া কর্মানুষ্ঠান করিলে পুরুষ পরমপদ প্রাপ্ত হন।
কর্মণৈব হি সংসিদ্ধিমাস্থিতা জনকাদয়ঃ।
লোকসংগ্রহমেবাপি সম্পশ্যন্ কর্তুমর্হসি।।২০
অনুবাদ
জনকাদি মহাত্মারা কর্মদ্বারাই সিদ্ধিলাভ করেন। লোক রক্ষার দিকে নজর রাখিয়াও তোমার কর্ম করা কর্তব্য।
যদ্যদাচরতি শ্রেষ্ঠস্তত্তদেবেতরো জনঃ।
স যৎ প্রমাণং কুরুতে লোকস্তদনুবর্ততে।।২১
অনুবাদ
শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি যাহা যাহা আচরণ করেন, অপর সাধারণেও তাহাই করে। তিনি যাহা প্রমাণ্য বা কর্তব্য বলিয়া গ্রহণ করেন, সাধারণ লোকে তাহারই অনুবর্তন করে।
ন মে পার্থাস্তি কর্তব্যং ত্রিষু লোকেষু কিঞ্চন।
নানবাপ্তমবাপ্তব্যং বর্ত এব চ কর্মণি।।২২
অনুবাদ
হে পার্থ, ত্রিলোক মধ্যে আমার করণীয় কিছু নাই। অপ্রাপ্ত বা প্রাপ্তব্য কিছু নাই। তথাপি আমি কর্মানুষ্ঠানেই ব্যাপৃত আছি।
যদি হ্যহং ন বর্তেয়ং জাতু কর্মণ্যতন্দ্রিতঃ।
মম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ।।২৩
অনুবাদ
হে পার্থ, অনলস হইয়া কর্মানুষ্ঠান না করি যদি, তবে মানবগণ সর্বপ্রকারে আমার পথের অনুবর্তী হইবে।
উৎসীদেয়ুরিমে লোকা ন কুর্যাং কর্ম চেদহম্।
সঙ্করস্য চ কর্তা স্যামুপহন্যামিমাঃ প্রজাঃ।।২৪
অনুবাদ
যদি আমি কর্ম না করি তাহা হইলে এই লোকসকল উৎসন্ন হইয়া যাইবে। আমি বর্ণ-সঙ্করাদি সামাজিক বিশৃঙ্খলার হেতু হইব এবং প্রজাগণের বিনাশের কারণ হইব।
সক্তাঃ কর্মণ্যবিদ্বাংসো যথা কুর্বন্তি ভারত।
কুর্যাদ্বিদ্বাংস্তথাসক্তশ্চিকীর্ষুর্লোকসংগ্রহম্।।২৫
অনুবাদ
হে ভারত, অজ্ঞ ব্যক্তিরা কর্মে আসক্তিবিশিষ্ট হইয়া সেরূপ কর্ম করিয়া থাকে। জ্ঞানীব্যক্তিরা অনাসক্তচিত্তে লোকরক্ষার্থে সেইরূপ কর্ম করিবেন।
ন বুদ্ধিভেদং জনয়েদজ্ঞানাং কর্মসঙ্গিনাম্।
জোষয়েৎ সর্বকর্মাণি বিদ্বান্ যুক্তঃ সমাচরন্।।২৬
অনুবাদ
জ্ঞানীরা কর্মে আসক্ত অজ্ঞানদিগের বুদ্ধিভেদ জন্মাইবেন না। আপনারা অবহিত হইয়া সকল কর্ম অনুষ্ঠান করিয়া তাহাদিগকে কর্মে নিযুক্ত রাখিবেন।
প্রকৃতেঃ ক্রিয়মাণানি গুণৈঃ কর্মাণি সর্বশঃ।
অহঙ্কারবিমূঢ়াত্মা কর্তাহমিতি মন্যতে।।২৭
অনুবাদ
প্রকৃতির গুণসমূহ দ্বারা সব রকমভাবে কর্মসকল সম্পন্ন হয়। যে অহঙ্কারে মুগ্ধচিত্ত, সে মনে করে আমিই কর্তা।
তত্ত্ববিত্তু মহাবাহো গুণকর্মবিভাগয়োঃ।
গুণা গুণেষু বর্তন্ত ইতি মত্বা ন সজ্জতে।।২৮
অনুবাদ
কিন্তু হে মহাবাহো, যিনি সত্ত্ব-রজস্-তমোগুণ ও মন-বুদ্ধি-ইন্দ্রিয়াদির বিভাগ ও উহাদের পৃথক পৃথক কর্মবিভাগতত্ত্ব জানিয়াছেন — তিনি ইন্দ্রিয়াদি ইন্দ্রিয়বিষয়ে প্রবৃত্ত আছে ইহা জানিয়া কর্মে আসক্ত হন না, কর্তৃত্বাভিমান করেন না।
প্রকৃতেগুণসংমূঢ়াঃ সজ্জন্তে গুণকর্মসু।
তানকৃৎস্নবিদো মন্দান্ কৃৎস্নবিন্ন বিচালয়েৎ।।২৯
অনুবাদ
তাহারাই দেহেন্দ্রিয়াদি কর্মে আসক্তিযুক্ত হয় যাহারা প্রকৃতিগুণে মোহিত। সেই সকল অল্পবুদ্ধি মন্দমতিদিগকে জ্ঞানিগণ কর্ম হইতে বিচলিত করিবেন না।
ময়ি সর্বাণি কর্মাণি সংন্যস্যাধ্যাত্মচেতসা।
নিরাশীর্নির্মমো ভূত্বা যুধ্যস্ব বিগতজ্বরঃ।।৩০
অনুবাদ
কর্তা ঈশ্বর, কর্ম করিতেছি তাঁহারই উদ্দেশে ভৃত্যবৎ — এইরূপ বিবেক-বুদ্ধি সহকারে সমস্ত কর্ম আমাতে সমর্পণ করিয়া, কামনাশূন্য ও মমতাশূন্য হইয়া শোক ত্যাগ পূর্বক তুমি যুদ্ধ কর।
যে মে মতমিদং নিত্যমনুতিষ্ঠন্তি মানবাঃ।
শ্রদ্ধাবন্তোহনসূয়ন্তো মুচ্যন্তে তেহপি কর্মভিঃ।।৩১
অনুবাদ
আমার এই মতের অনুষ্ঠান যে মানবগণ শ্রদ্ধাবান্ ও অসূয়াশূন্য হইয়া করেন — তাঁহারাই কর্মবন্ধন হইতে মুক্ত হন।
যে ত্বেতদভ্যসূয়ন্তো নানুতিষ্ঠন্তি মে মতম্।
সর্বজ্ঞানবিমূঢ়াংস্তান্ বিদ্ধি নষ্টানচেতসঃ।।৩২
অনুবাদ
আমার এই মতের অনুষ্ঠান যাহারা অসূয়াপরবশ হইয়া করে না — সেই বিবেকহীন ব্যক্তিগণকে সর্বজ্ঞান-বিমূঢ় ও বিনষ্ট বলিয়া জানিও।
সদৃশং চেষ্টতে স্বস্যাঃ প্রকৃতেজ্ঞানবানপি।
প্রকৃতিং যান্তি ভূতানি নিগ্রহঃ কিং করিষ্যতি।।৩৩
অনুবাদ
জ্ঞানবান্ ব্যক্তিও নিজ প্রকৃতির অনুরূপ কর্ম করিয়া থাকেন। প্রাণীগণ প্রকৃতির অনুসরণ করে — ইন্দ্রিয়নিগ্রহে কি করে?
ইন্দ্রিয়স্যেন্দ্রিয়স্যার্থে রাগদ্বেষৌ ব্যবস্থিতৌ।
তয়োর্ন বশমাগচ্ছেৎ তৌ হ্যস্য পরিপন্থিনৌ।।৩৪
অনুবাদ
সকল ইন্দ্রিয়েরই স্ব স্ব বিষয়ে রাগদ্বেষ অবশ্যম্ভাবী। ঐ রাগদ্বেষের বশীভূত হইও না — উহারা জীবের শত্রু।
শ্রেয়ান্ স্বধর্মো বিগুণঃ পরধর্মাৎ স্বনুষ্ঠিতাৎ।
স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্মো ভয়াবহঃ।।৩৫
অনুবাদ
স্বধর্ম কিঞ্চিদ্দোষবিশিষ্ট হইলেও উহা উত্তমরূপে অনুষ্ঠিত পরধর্ম অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। স্বধর্মে নিধনও কল্যাণকর, কিন্তু পরধর্ম গ্রহণ করা বিপজ্জনক।
অথ কেন প্রযুক্তোহয়ং পাপং চরতি পূরুষঃ।
অনিচ্ছন্নপি বার্ষ্ণেয় বলাদিব নিয়োজিতঃ।।৩৬
অনুবাদ
অর্জুন বলিলেন — হে কৃষ্ণ, লোকে কাহার দ্বারা প্রযুক্ত হইয়া অনিচ্ছাসত্ত্বেও যেন বলপূর্বক নিয়োজিত হইয়াই পাপাচরণ করে?
কাম এষ ক্রোধ এষ রজোগুণসমুদ্ভবঃ।
মহাশনো মহাপাপ্মা বিদ্ধ্যেনমিহ বৈরিণম্।।৩৭
অনুবাদ
শ্রীভগবান বলিলেন — ইহাই কাম ও ইহাই ক্রোধ। রজোগুণোৎপন্ন ইহা দুষ্পূরণীয় এবং অতিশয় উগ্র। সংসারে ইহাকেই শত্রু বলিয়া জানিবে।
ধূমেনাব্রিয়তে বহ্নির্যথাদর্শো মলেন চ।
যথোল্বেনাবৃতো গর্ভস্তথা তেনেদমাবৃতম্।।৩৮
অনুবাদ
ধূমদ্বারা বহ্নি যেমন আবৃত থাকে, মলদ্বারা দর্পণ আবৃত হয়, জরায়ুদ্বারা গর্ভ আবৃত থাকে — তেমনই জ্ঞান আবৃত থাকে কামের দ্বারা।
আবৃতং জ্ঞানমেতেন জ্ঞানিনো নিত্যবৈরিণা।
কামরূপেণ কৌন্তেয় দুষ্পূরেণানলেন চ।।৩৯
অনুবাদ
হে কৌন্তেয়, জ্ঞানীদিগের নিত্যশত্রু এই দুষ্পূরণীয় অগ্নিতুল্য কামদ্বারা জ্ঞান আচ্ছন্ন থাকে।
ইন্দ্রিয়াণি মনো বুদ্ধিরস্যাধিষ্ঠানমুচ্যতে।
এতৈর্বিমোহয়ত্যেষ জ্ঞানমাবৃত্য দেহিনম্।।৪০
অনুবাদ
ইন্দ্রিয়সকল, মন ও বুদ্ধি — ইহারা কামের অধিষ্ঠান বা আশ্রয়স্থান বলিয়া কথিত হয়। জ্ঞানকে আচ্ছন্ন করিয়া কাম ইহাদিগকে অবলম্বন করিয়া জীবকে মুগ্ধ করে।
তস্মাত্ত্বমিন্দ্রিয়াণ্যাদৌ নিয়ম্য ভরতর্ষভ।
পাপ্মানং প্রজহি হ্যেনং জ্ঞানবিজ্ঞাননাশনম্।।৪১
অনুবাদ
হে ভারতশ্রেষ্ঠ, ইন্দ্রিয়গণকে তুমি অগ্রে বশীভূত করিয়া বিনষ্ট কর এই জ্ঞান-বিজ্ঞান-বিনাশী পাপস্বরূপ কামকে।
ইন্দ্রিয়াণি পরাণ্যাহুরিন্দ্রিয়েভ্যঃ পরং মনঃ।
মনসস্তু পরা বুদ্ধির্যো বুদ্ধেঃ পরতস্তু সঃ।।৪২
অনুবাদ
শ্রেষ্ঠ বলিয়া কথিত হয় ইন্দ্রিয়সকল। মন আবার ইন্দ্রিয়সকল অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। বুদ্ধি শ্রেষ্ঠ মন অপেক্ষা। বুদ্ধি হইতে যিনি শ্রেষ্ঠ, তিনি তো আত্মা।
এবং বুদ্ধেঃ পরং বুদ্ধ্বা সংস্তভ্যাত্মানমাত্মনা।
জহি শত্রুং মহাবাহো কামরূপং দুরাসদম্।।৪৩
অনুবাদ
হে মহাবাহো, বুদ্ধিরও উপরে অবস্থিত পরমাত্মা সম্বন্ধে সচেতন হইয়া, আত্মাকে আত্মশক্তির প্রয়োগেই ধীর ও নিশ্চল কর এবং দুর্নিবার শত্রু কামকে বিনাশ কর।
ইতি কর্মযোগ নামক
তৃতীয় অধ্যায় সমাপ্ত।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতোপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং
যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে
কর্মযোগো নাম তৃতীয়োহধ্যায়ঃ