🌅

ওঁ নমো ভগবতে বাসুদেবায়

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা

পঞ্চম অধ্যায়

সন্ন্যাসযোগ

Sannyasa Yoga

শ্লোক ২৯

সন্ন্যাস ও কর্মযোগ উভয়েই মুক্তির পথ।
তবে অনাসক্তচিত্তে কর্মই শ্রেষ্ঠ সন্ন্যাস।
ব্রহ্মজ্ঞানী পুরুষ কর্মে থাকিয়াও মুক্ত।

↓ নিচে স্ক্রল করুন
অর্জুন উবাচ
✦ সন্ন্যাস না কর্মযোগ? ✦

সন্ন্যাসং কর্মণাং কৃষ্ণ পুনর্যোগঞ্চ শংসসি।
যচ্ছ্রেয় এতয়োরেকং তন্মে ব্রূহি সুনিশ্চিতম্।।১

অনুবাদ

অর্জুন কহিলেন — হে কৃষ্ণ, কর্মত্যাগ ও কর্মযোগ উভয়ই তুমি বলিতেছ। উভয়ের মধ্যে যাহা শ্রেয়স্কর সেই একটি আমাকে নিশ্চয় করিয়া বল।

শ্রীভগবানুবাচ

সন্ন্যাসঃ কর্মযোগশ্চ নিঃশ্রেয়সকরাবুভৌ।
তয়োস্তু কর্মসন্ন্যাসাৎ কর্মযোগো বিশিষ্যতে।।২

অনুবাদ

শ্রীভগবান বলিলেন — সন্ন্যাস ও কর্মযোগ উভয়েই মোক্ষপ্রদ, কিন্তু উভয়ের মধ্যে কর্মসন্ন্যাস অপেক্ষা কর্মযোগই শ্রেষ্ঠ।

জ্ঞেয়ঃ স নিত্যসন্ন্যাসী যো ন দ্বেষ্টি ন কাঙ্ক্ষতি।
নির্দ্বন্দো হি মহাবাহো সুখং বন্ধাৎ প্রমুচ্যতে।।৩

অনুবাদ

হে মহাবাহো, যিনি কিছু আকাঙ্ক্ষা করেন না, রাগ দ্বেষও করেন না — তাঁহাকে নিত্য সন্ন্যাসী জানিও। তাদৃশ রাগদ্বেষাদি দ্বন্দুশূন্য শুদ্ধচিত্ত পুরুষ অনায়াসে সংসারবন্ধন হইতে মুক্তিলাভ করেন।

সাংখ্যযোগৌ পৃথগ্বালাঃ প্রবদন্তি ন পণ্ডিতাঃ।
একমপ্যাস্থিতঃ সম্যগুভয়োর্বিন্দতে ফলম্।।৪

অনুবাদ

সন্ন্যাস ও কর্মযোগকে পৃথক বলিয়া থাকেন অজ্ঞ ব্যক্তিগণই, পণ্ডিতগণ এরূপ বলেন না। ইহার একটি সম্যকরূপে অনুষ্ঠিত হইলে উভয়ের ফল লাভ হয়।

যৎ সাংখ্যৈঃ প্রাপ্যতে স্থানং তদ্যোগৈরপি গম্যতে।
একং সাংখ্যঞ্চ যোগঞ্চ যঃ পশ্যতি স পশ্যতি।।৫

অনুবাদ

সাংখ্যাগণ ও কর্মযোগিগণ একই স্থান লাভ করেন। যথার্থদর্শী তিনিই যিনি সন্ন্যাস ও কর্মযোগকে একরূপ দেখেন।

সন্ন্যাসস্তু মহাবাহো দুঃখমাপ্তুমযোগতঃ।
যোগযুক্তো মুনির্ব্রহ্ম ন চিরেণাধিগচ্ছতি।।৬

অনুবাদ

হে মহাবাহো, সন্ন্যাস কেবল দুঃখের কারণ হয় কর্মযোগ বিনা। কিন্তু কর্মযোগযুক্ত সাধক অচিরেই ব্রহ্মসাক্ষাৎকার লাভ করেন।

✦ নিষ্কাম কর্মী — কর্মে অকর্তা ✦

যোগযুক্তো বিশুদ্ধাত্মা বিজিতাত্মা জিতেন্দ্রিয়ঃ।
সর্বভূতাত্মভূতাত্মা কুর্বন্নপি ন লিপ্যতে।।৭

অনুবাদ

কর্মযোগযুক্ত যিনি বিশুদ্ধচিত্ত, সংযতদেহ, জিতেন্দ্রিয় এবং সর্বভূতের আত্মাই যাঁহার আত্মস্বরূপ — এইরূপ সম্যগ্দর্শী পুরুষ কর্ম করিয়াও কামে আবদ্ধ হন না।

নৈব কিঞ্চিৎ করোমীতি যুক্তো মন্যেত তত্ত্ববিৎ।
পশ্যন্ শৃণ্বন্ স্পৃশন্ জিঘ্রন্নশন্ গচ্ছন্ স্বপন্ শ্বসন্।।৮

অনুবাদ

কর্মযোগে যুক্ত তত্ত্বদর্শী পুরুষ দর্শন, শ্রবণ, স্পর্শ, ঘ্রাণ, ভোজন, গমন, নিদ্রা, নিঃশ্বাস গ্রহণ, কথন, ত্যাগ, গ্রহণ, উন্মেষ ও নিমেষ ইত্যাদি কাজ করিয়াও মনে করেন —

প্রলপন্ বিসৃজন্ গৃহ্ণন্নুন্মিষন্নিমিষন্নপি।
ইন্দ্রিয়াণীন্দ্রিয়ার্থেষু বর্তন্ত ইতি ধারয়ন্।।৯

অনুবাদ

ইন্দ্রিয়সকলই ইন্দ্রিয়বিষয়ে প্রবৃত্ত হইতেছে — আমি কিছুই করি না। এইরূপ ধারণা পোষণ করিয়া কর্ম করেন।

১০

ব্রহ্মণ্যাধায় কর্মাণি সঙ্গং ত্যক্ত্বা করোতি যঃ।
লিপ্যতে ন স পাপেন পদ্মপত্রমিবাম্ভসা।।১০

অনুবাদ

যিনি ব্রহ্মে সমুদয় কর্ম স্থাপনপূর্বক ফলাসক্তি ও কর্তৃত্বাভিমান ত্যাগ করিয়া কর্ম করেন — তিনি পাপে লিপ্ত হন না, যেমন পদ্মপত্র জলসংসৃষ্ট থাকিয়াও জলদ্বারা লিপ্ত হয় না।

১১

কায়েন মনসা বুদ্ধ্যা কেবলৈরিন্দ্রিয়ৈরপি।
যোগিনঃ কর্ম কুর্বন্তি সঙ্গং ত্যক্ত্বাত্মশুদ্ধয়ে।।১১

অনুবাদ

ফলকামনা ও কর্তৃত্বাভিনিবেশ পরিত্যাগ করিয়া কর্মযোগিগণ চিত্তশুদ্ধির নিমিত্ত কেবল শরীর, মন, বুদ্ধি ও ইন্দ্রিয়াদি দ্বারা কর্ম করিয়া থাকেন।

১২

যুক্তঃ কর্মফলং ত্যক্ত্বা শান্তিমাপ্নোতি নৈষ্ঠিকীম্।
অযুক্তঃ কামকারেণ ফলে সক্তো নিবধ্যতে।।১২

অনুবাদ

কর্মফল ত্যাগ করিয়া নিষ্কাম কর্মযোগিগণ সর্বদুঃখনিবৃত্তিরূপ স্থিরা শান্তি লাভ করেন। সকাম বহির্মুখ ব্যক্তিগণ কামনাবশতঃ ফলে আসক্ত হইয়া বন্ধনদশা প্রাপ্ত হন।

১৩

সর্বকর্মাণি মনসা সংন্যস্যাস্তে সুখং বশী।
নবদ্বারে পুরে দেহী নৈব কুর্বন্ন কারয়ন্।।১৩

অনুবাদ

মনে মনে সর্বকর্ম ত্যাগ করিয়া জিতেন্দ্রিয় পুরুষ নবদ্বারযুক্ত দেহে সুখে বাস করেন। তিনি নিজে কিছু করেন না এবং অন্যকে কিছু করান না।

✦ ঈশ্বর কর্তা নন — জ্ঞানই আলো ✦
১৪

ন কর্তৃত্বং ন কর্মাণি লোকস্য সৃজতি প্রভুঃ।
ন কর্মফলসংযোগং স্বভাবস্তু প্রবর্ততে।।১৪

অনুবাদ

লোকের কর্তৃত্ব প্রভু সৃষ্টি করেন না, কর্মও সৃষ্টি করেন না, সুখদুঃখরূপ কর্মফলসম্বন্ধও রচনা করেন না — কিন্তু প্রকৃতিই কর্মে প্রবৃত্ত হয়।

১৫

নাদত্তে কস্যচিৎ পাপং ন চৈব সুকৃতং বিভুঃ।
অজ্ঞানেনাবৃতং জ্ঞানং তেন মুহ্যন্তি জন্তবঃ।।১৫

অনুবাদ

পাপ ও পুণ্য সর্বব্যাপী আত্মা কখনও গ্রহণ করেন না। অজ্ঞানকর্তৃক জ্ঞান আচ্ছন্ন থাকে বলিয়া জীব মোহপ্রাপ্ত হয়।

১৬

জ্ঞানেন তু তদজ্ঞানং যেষাং নাশিতমাত্মনঃ।
তেষামাদিত্যবজ্জ্ঞানং প্রকাশয়তি তৎপরম্।।১৬

অনুবাদ

যাঁহাদের আত্মজ্ঞান দ্বারা সেই অজ্ঞান নষ্ট হইয়াছে — সেই জ্ঞান তাঁহাদের সূর্যের ন্যায় পরমতত্ত্ব প্রকাশ করিয়া দেয়।

✦ ব্রহ্মজ্ঞানী ও সমদর্শন ✦
১৭

তদ্বুদ্ধয়স্তদাত্মানস্তন্নিষ্ঠাস্তৎপরায়ণাঃ।
গচ্ছন্ত্যপুনরাবৃত্তিং জ্ঞাননির্ধূতকল্মষাঃ।।১৭

অনুবাদ

যাঁহাদের নিশ্চয়াত্মিকা বুদ্ধি সেই পরম পুরুষেই নিবিষ্ট, তাহাতেই যাঁহাদের আত্মভাব, তাহাতেই যাঁহাদের নিষ্ঠা, তিনিই যাঁহাদের পরমগতি — তাঁহাদের আর পুনরায় দেহধারণ করিতে হয় না, কারণ জ্ঞানের দ্বারা তাঁহাদের অজ্ঞান দূরীভূত হইয়াছে।

১৮

বিদ্যাবিনয়সম্পন্নে ব্রাহ্মণে গবি হস্তিনি।
শুনি চৈব শ্বপাকে চ পণ্ডিতাঃ সমদর্শিনঃ।।১৮

অনুবাদ

বিদ্যাবিনয়যুক্ত ব্রাহ্মণে, গাভীতে, হস্তীতে, কুকুরে এবং চণ্ডালে — আত্মবিৎ পণ্ডিতগণ সমদর্শী।

১৯

ইহৈব তৈর্জিতঃ সর্গো যেষাং সাম্যে স্থিতং মনঃ।
নির্দোষং হি সমং ব্রহ্ম তস্মাদ্ ব্রহ্মণি তে স্থিতাঃ।।১৯

অনুবাদ

সাম্যে যাঁহাদিগের মন অবস্থিত — ইহলোকে থাকিয়াই তাঁহারা এই জনন-মরণরূপ সংসার অতিক্রম করেন। যেহেতু ব্রহ্ম সম ও নির্দোষ, সুতরাং সেই সমদর্শী পুরুষগণ ব্রহ্মেই অবস্থিতি করেন।

২০

ন প্রহৃষ্যেৎ প্রিয়ং প্রাপ্য নোদ্বিজেৎ প্রাপ্য চাপ্রিয়ম্।
স্থিরবুদ্ধিরসংমূঢ়ো ব্রহ্মবিদ্ ব্রহ্মণি স্থিতঃ।।২০

অনুবাদ

ঈদৃশ ব্রহ্মজ্ঞ ব্যক্তি স্থিরবুদ্ধি, সর্বপ্রকার মোহবর্জিত এবং ব্রহ্মেই অবস্থিত। সুতরাং তিনি প্রিয়বস্তু লাভেও হৃষ্ট হন না, অপ্রিয় সমাগমেও উদ্বিগ্ন হন না।

✦ বাহ্য ভোগের ক্ষণস্থায়িতা ✦
২১

বাহ্যস্পর্শেষ্বসক্তাত্মা বিন্দত্যাত্মনি যৎ সুখম্।
স ব্রহ্মযোগযুক্তাত্মা সুখমক্ষয়মশ্নুতে।।২১

অনুবাদ

বাহ্য বিষয়ে অনাসক্ত পুরুষ ব্রহ্মে সমাহিতচিত্ত হইয়া আত্মায় যে আনন্দ আছে তাহা লাভ করেন। তিনি অক্ষয় আনন্দ উপভোগ করেন।

২২

যে হি সংস্পর্শজা ভোগা দুঃখযোনয় এব তে।
আদ্যন্তবন্তঃ কৌন্তেয় ন তেষু রমতে বুধঃ।।২২

অনুবাদ

হে কৌন্তেয়, বিষয়ভোগজনিত যে সকল সুখ — সে সকল নিশ্চয়ই দুঃখের হেতু এবং আদি ও অন্তবিশিষ্ট। বিবেকী ব্যক্তি উহাতে রত হন না।

২৩

শক্নোতীহৈব যঃ সোঢুং প্রাক্শরীরবিমোক্ষণাৎ।
কামক্রোধোদ্ভবং বেগং স যুক্তঃ স সুখী নরঃ।।২৩

অনুবাদ

সংসারে থাকিয়াই যিনি দেহত্যাগ করিবার পূর্বে কামক্রোধজাত বেগ প্রতিরোধ করিতে পারেন — তিনিই যোগী, সুখী ও পুরুষ।

✦ ব্রহ্মনির্বাণ ও মুক্তির পথ ✦
২৪

যোহন্তঃসুখোহন্তরারামস্তথান্তর্জ্যোতিরেব যঃ।
স যোগী ব্রহ্মনির্বাণং ব্রহ্মভূতোহধিগচ্ছতি।।২৪

অনুবাদ

অন্তরেই যাঁহার সুখ, আরাম ও শান্তি, অন্তরেই যাঁহার আলোক — ব্রহ্মভাব প্রাপ্ত হইয়া সেই যোগী ব্রহ্মেই নির্বাণ প্রাপ্ত হন।

২৫

লভন্তে ব্রহ্মনির্বাণমৃষয়ঃ ক্ষীণকল্মষাঃ।
ছিন্নদ্বৈধা যতাত্মানঃ সর্বভূতহিতে রতাঃ।।২৫

অনুবাদ

নিষ্পাপ, সংশয়শূন্য, সংযতচিত্ত, সর্বভূতহিতে রত যাঁহারা — সেইরূপ ঋষিগণ ব্রহ্মনির্বাণ প্রাপ্ত হন।

২৬

কামক্রোধবিযুক্তানাং যতীনাং যতচেতসাম্।
অভিতো ব্রহ্মনির্বাণং বর্ততে বিদিতাত্মনাম্।।২৬

অনুবাদ

কামক্রোধবিমুক্ত, সংযতচিত্ত, আত্মদর্শী যতিগণের ব্রহ্মনির্বাণ নিকটেই, চারিদিকেই বর্তমান। অতএব তাঁহারা ব্রহ্মনির্বাণের মধ্যেই বাস করেন।

✦ ধ্যানযোগ ও চরম শান্তি ✦
২৭

স্পর্শান্ কৃত্বা বহির্বাহ্যাংশ্চক্ষুশ্চৈবান্তরে ভ্রুবোঃ।
প্রাণাপানৌ সমৌ কৃত্বা নাসাভ্যন্তরচারিণৌ।।২৭

অনুবাদ

বাহ্যবিষয়সমূহ মন হইতে বহিষ্কৃত করিয়া, চক্ষুদ্বয়কে ভ্রূমধ্যে স্থাপন করিয়া, প্রাণ ও অপান বায়ুর ঊর্ধ্ব ও অধোগতি সমান করিয়া তাহাদের নাসামধ্যে রাখেন।

২৮

যতেন্দ্রিয়মনোবুদ্ধির্মুনির্মোক্ষপরায়ণঃ।
বিগতেচ্ছাভয়ক্রোধো যঃ সদা মুক্ত এব সঃ।।২৮

অনুবাদ

ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধিকে সংযত করিয়াছেন এবং যিনি মোক্ষপরায়ণ, ইচ্ছা-ভয়-ক্রোধবর্জিত ও আত্মমননশীল — তিনি সর্বদাই মুক্ত।

২৯

ভোক্তারং যজ্ঞতপসাং সর্বলোকমহেশ্বরম্।
সুহৃদং সর্বভূতানাং জ্ঞাত্বা মাং শান্তিমৃচ্ছতি।।২৯

অনুবাদ

মুক্ত যোগিপুরুষ আমাকে যজ্ঞ ও তপস্যাসমূহের ভোক্তা, সর্বলোকের মহেশ্বর এবং সর্বভূতের সুহৃদ জানিয়া পরম শান্তি লাভ করেন।

🌅

ইতি সন্ন্যাসযোগ নামক
পঞ্চম অধ্যায় সমাপ্ত।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতোপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং
যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে
সন্ন্যাসযোগো নাম পঞ্চমোহধ্যায়ঃ