ইদং তু তে গুহ্যতমং প্রবক্ষ্যাম্যনসূয়বে।
জ্ঞানং বিজ্ঞানসহিতং যজ্জ্ঞাত্বা মোক্ষ্যসেহশুভাৎ।।১
অনুবাদ
শ্রীভগবান বলিলেন — অসূয়াশূন্য, দোষদৃষ্টিহীন তুমি। তোমাকে এই অতি গুহ্য বিজ্ঞানসহিত ঈশ্বরবিষয়ক জ্ঞান বলিতেছি। ইহা জ্ঞাত হইলে তুমি সংসারদুঃখ হইতে মুক্ত হইবে।
রাজবিদ্যা রাজগুহ্যং পবিত্রমিদমুত্তমম্।
প্রত্যক্ষাবগমং ধর্ম্যং সুসুখং কর্তুমব্যয়ম্।।২
অনুবাদ
ইহা রাজবিদ্যা, রাজগুহ্য — অর্থাৎ সকল বিদ্যা ও গুহ্য বিষয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। ইহা সর্বোৎকৃষ্ট পবিত্র, সর্বধর্মের ফলস্বরূপ, প্রত্যক্ষ বোধগম্য, সুখসাধ্য এবং অক্ষয় ফলপ্রদ।
অশ্রদ্দধানাঃ পুরুষা ধর্মস্যাস্য পরন্তপ।
অপ্রাপ্য মাং নিবর্তন্তে মৃত্যুসংসারবর্ত্মনি।।৩
অনুবাদ
হে পরন্তপ, এই ধর্মের প্রতি অশ্রদ্ধাবান্ ব্যক্তিগণ আমাকে পায় না। তাঁহারা মৃত্যুময় সংসারপথে পরিভ্রমণ করিয়া থাকে।
ময়া ততমিদং সর্বং জগদব্যক্তমূর্তিনা।
মৎস্থানি সর্বভূতানি ন চাহং তেষ্ববস্থিতঃ।।৪
অনুবাদ
অব্যক্তস্বরূপে এই সমস্ত জগৎ ব্যাপিয়া আমি আছি। আমাতে অবস্থিত সমস্ত ভূত — আমি কিন্তু তৎসমুদয়ে অবস্থিত নহি।
ন চ মৎস্থানি ভূতানি পশ্য মে যোগমৈশ্বরম্।
ভূতভৃন্ন চ ভূতস্থো মমাত্মা ভূতভাবনঃ।।৫
অনুবাদ
আমার ঐশ্বরিক যোগ তুমি দর্শন কর। আমাতে এই ভূতসকলও স্থিতি করিতেছে না — আমি ভূতধারক ও ভূতপালক, কিন্তু ভূতগণে অবস্থিত নহি।
যথাকাশস্থিতো নিত্যং বায়ুঃ সর্বত্রগো মহান্।
তথা সর্বাণি ভূতানি মৎস্থানীত্যুপধারয়।।৬
অনুবাদ
যেমন সর্বত্র গমনশীল মহান বায়ু আকাশে অবস্থিত — সেইরূপ সমস্ত ভূত আমাতে অবস্থিত, ইহা জানিও।
সর্বভূতানি কৌন্তেয় প্রকৃতিং যান্তি মামিকাম্।
কল্পক্ষয়ে পুনস্তানি কল্পাদৌ বিসৃজাম্যহম্।।৭
অনুবাদ
হে কৌন্তেয়, সকল ভূত কল্পের শেষে আমার ত্রিগুণাত্মিকা প্রকৃতিতে আসিয়া বিলীন হয় এবং কল্পের আরম্ভে ঐ সকল পুনরায় আমি সৃষ্টি করি।
প্রকৃতিং স্বামবষ্টভ্য বিসৃজামি পুনঃ পুনঃ।
ভূতগ্রামমিমং কৃৎস্নমবশং প্রকৃতের্বশাৎ।।৮
অনুবাদ
আমি স্বীয় প্রকৃতিকে আত্মবশে রাখিয়া স্বীয় স্বীয় প্রাক্তনকর্মনিমিত্ত স্বভাববশে জন্মমৃত্যু পরবশ ভূতগণকে পুনঃ পুনঃ সৃষ্টি করি।
ন চ মাং তানি কর্মাণি নিবধ্নন্তি ধনঞ্জয়।
উদাসীনবদাসীনমসক্তং তেষু কর্মসু।।৯
অনুবাদ
হে ধনঞ্জয়, আমাকে কিন্তু সেই সকল কর্ম আবদ্ধ করিতে পারে না। কারণ, আমি সেই সকল কর্মে অনাসক্ত, উদাসীনবৎ অবস্থিত।
ময়াধ্যক্ষেণ প্রকৃতিঃ সূয়তে সচরাচরম্।
হেতুনানেন কৌন্তেয় জগদ্বিপরিবর্ততে।।১০
অনুবাদ
হে কৌন্তেয়, আমার অধিষ্ঠানবশতঃই প্রকৃতি এই চরাচর জগৎ প্রসব করে। এই হেতুই জগৎ বারবার উৎপন্ন হইয়া থাকে।
অবজানন্তি মাং মূঢ়া মানুষীং তনুমাশ্রিতম্।
পরং ভাবমজানন্তো মম ভূতমহেশ্বরম্।।১১
অনুবাদ
অবিবেকী ব্যক্তিগণ সর্বভূত মহেশ্বরস্বরূপ আমার পরম ভাব না জানিয়া মনুষ্যদেহধারী বলিয়া আমার অবজ্ঞা করিয়া থাকে।
মোঘাশা মোঘকর্মাণো মোঘজ্ঞানা বিচেতসঃ।
রাক্ষসীমাসুরীঞ্চৈব প্রকৃতিং মোহিনীং শ্রিতাঃ।।১২
অনুবাদ
এই সকল বিবেকহীন ব্যক্তি বুদ্ধিভ্রংশকরী তামসী ও রাজসী প্রকৃতির বশে আমাকে অবজ্ঞা করিয়া থাকে। উহাদের আশা ব্যর্থ, কর্ম নিষ্ফল, জ্ঞান নিরর্থক ও চিত্ত বিক্ষিপ্ত।
মহাত্মানস্তু মাং পার্থ দৈবীং প্রকৃতিমাশ্রিতাঃ।
ভজন্ত্যনন্যমনসো জ্ঞাত্বা ভূতাদিমব্যয়ম্।।১৩
অনুবাদ
কিন্তু হে পার্থ, সাত্ত্বিকী প্রকৃতিপ্রাপ্ত মহাত্মাগণ অনন্যচিত্ত হইয়া আমাকে সর্বভূতের কারণ ও অব্যয়স্বরূপ জানিয়া ভজনা করেন।
সততং কীর্তয়ন্তো মাং যতন্তশ্চ দৃঢ়ব্রতাঃ।
নমস্যন্তশ্চ মাং ভক্ত্যা নিত্যযুক্তা উপাসতে।।১৪
অনুবাদ
তাঁহারা যত্নশীল ও দৃঢ়ব্রত হইয়া ভক্তিপূর্বক সর্বদা আমার কীর্তন এবং বন্দনা করিয়া নিত্য সমাহিতচিত্তে আমার উপাসনা করেন।
জ্ঞানযজ্ঞেন চাপ্যন্যে যজন্তো মামুপাসতে।
একত্বেন পৃথক্ত্বেন বহুধা বিশ্বতোমুখম্।।১৫
অনুবাদ
কেহ কেহ জ্ঞানরূপ যজ্ঞদ্বারা আমার আরাধনা করেন। কেহ অভেদভাবে, কেহ পৃথকভাবে, কেহ বা সর্বময় সর্বাত্মা আমাকে নানাভাবে উপাসনা করেন।
অহং ক্রতুরহং যজ্ঞঃ স্বধাহহমহমৌষধম্।
মন্ত্রোহহমহমেবাজ্যমহমগ্নিরহং হুতম্।।১৬
অনুবাদ
আমি ক্রতু, যজ্ঞ, স্বধা, ঔষধ, মন্ত্র, হোমাদিসাধন ঘৃত — আমি অগ্নি, আমিই হোম।
পিতাহহমস্য জগতো মাতা ধাতা পিতামহঃ।
বেদ্যং পবিত্রমোঙ্কার ঋক্ সাম যজুরেব চ।।১৭
অনুবাদ
এই জগতের পিতা, মাতা, বিধাতা, পিতামহ আমিই। আমিই যাহা কিছু পবিত্র বস্তু ও জ্ঞেয়। আমি ব্রহ্মবাচক ওঙ্কার, আমিই ঋক্, সাম ও যজুর্বেদস্বরূপ।
গতির্ভর্তা প্রভুঃ সাক্ষী নিবাসঃ শরণং সুহৃৎ।
প্রভবঃ প্রলয়ঃ স্থানং নিধানং বীজমব্যয়ম্।।১৮
অনুবাদ
আমি গতি, ভর্তা, প্রভু, শুভাশুভ দ্রষ্টা, স্থিতিস্থান, রক্ষক, সুহৃৎ, স্রষ্টা, সংহর্তা, আধার — আমিই লয়স্থান এবং অবিনাশী বীজস্বরূপ।
তপাম্যহমহং বর্ষং নিগৃহ্ণাম্যুৎসৃজামি চ।
অমৃতঞ্চৈব মৃত্যুশ্চ সদসচ্চাহমর্জুন।।১৯
অনুবাদ
হে অর্জুন, আমি উত্তাপদান করি, আমি ভূমি হইতে জল আকর্ষণ করি, জল বর্ষণ করি পুনর্বার। জীবের জীবন আমি, আমিই জীবের মৃত্যু — আমি সৎ, আমিই অসৎ।
ত্রৈবিদ্যা মাং সোমপাঃ পূতপাপা যজ্ঞৈরিষ্ট্বা স্বর্গতিং প্রার্থয়ন্তে।
তে পুণ্যমাসাদ্য সুরেন্দ্রলোকমশ্নন্তি দিব্যান্ দিবি দেবভোগান্।।২০
অনুবাদ
ত্রিবেদোক্ত যজ্ঞাদি কর্মপরায়ণ ব্যক্তিগণ যজ্ঞাদি দ্বারা আমার পূজা করিয়া যজ্ঞশেষে সোমরস পানে নিষ্পাপ হন এবং স্বর্গলাভ কামনা করে। তাঁহারা পবিত্র স্বর্গলোক প্রাপ্ত হইয়া দিব্য দেবভোগসমূহ ভোগ করিয়া থাকেন।
তে তং ভুক্ত্বা স্বর্গলোকং বিশালং ক্ষীণে পুণ্যে মর্ত্যলোকং বিশন্তি।
এবং ত্রয়ীধর্মমনুপ্রপন্না গতাগতং কামকামা লভন্তে।।২১
অনুবাদ
তাঁহারা তাঁহাদের প্রার্থিত বিপুল স্বর্গসুখ উপভোগ করিয়া পুণ্যক্ষয় হইলে পুনরায় মর্ত্যলোকে প্রবেশ করেন। এইরূপে কামনাভোগপরবশ এই ব্যক্তিগণ বেদোক্ত ধর্ম অনুষ্ঠান করিয়া পুনঃ পুনঃ সংসারে যাতায়াত করিয়া থাকেন।
অনন্যাশ্চিন্তয়ন্তো মাং যে জনাঃ পর্যুপাসতে।
তেষাং নিত্যাভিযুক্তানাং যোগক্ষেমং বহাম্যহম্।।২২
অনুবাদ
আমার চিন্তা করিতে করিতে অনন্যচিত্ত হইয়া যে ভক্তগণ আমার উপাসনা করেন — আমাতে নিত্যযুক্ত সেই সমস্ত ভক্তের যোগ ও ক্ষেম আমি বহন করিয়া থাকি।
যেহপ্যন্যদেবতাভক্তা যজন্তে শ্রদ্ধয়ান্বিতাঃ।
তেহপি মামেব কৌন্তেয় যজন্ত্যবিধিপূর্বকম্।।২৩
অনুবাদ
হে কৌন্তেয়, অন্য দেবতার ভক্তিমান্ হইয়া যাহারা শ্রদ্ধাযুক্তচিত্তে তাঁহাদের পূজা করে — তাহারাও আমাকেই পূজা করে, কিন্তু অবিধিপূর্বক।
অহং হি সর্বযজ্ঞানাং ভোক্তা চ প্রভুরেব চ।
ন তু মামভিজানন্তি তত্ত্বেনাতশ্চ্যবন্তি তে।।২৪
অনুবাদ
সর্বযজ্ঞের ভোক্তা ও ফলদাতা আমিই। যথার্থরূপে তাঁহারা আমাকে জানে না বলিয়া সংসারে পতিত হয়।
যান্তি দেবব্রতা দেবান্ পিতৃন্ যান্তি পিতৃব্রতাঃ।
ভূতানি যান্তি ভূতেজ্যা যান্তি মদ্যাজিনোহপি মাম্।।২৫
অনুবাদ
ইন্দ্রাদি দেবগণের পূজকেরা দেবলোক প্রাপ্ত হন। পিতৃগণের পূজকেরা পিতৃলোক প্রাপ্ত হন। ভূতপূজকেরা ভূতলোক প্রাপ্ত হন এবং যাঁহারা আমাকে পূজা করেন তাঁহারা আমাকেই প্রাপ্ত হন।
পত্রং পুষ্পং ফলং তোয়ং যো মে ভক্ত্যা প্রযচ্ছতি।
তদহং ভক্ত্যুপহৃতমশ্নামি প্রযতাত্মনঃ।।২৬
অনুবাদ
পত্র, পুষ্প, ফল, জল — যাহা কিছু আমারে যিনি ভক্তিপূর্বক দান করেন, আমি সেই শুদ্ধচিত্ত ভক্তের ভক্তিপূর্বক প্রদত্ত উপহার গ্রহণ করিয়া থাকি।
যৎ করোষি যদশ্নাসি যজ্জুহোষি দদাসি যৎ।
যত্তপস্যসি কৌন্তেয় তৎ কুরুষ্ব মদর্পণম্।।২৭
অনুবাদ
হে কৌন্তেয়, যাহা কিছু তুমি কর, যাহা কিছু ভোজন কর, যাহা কিছু হোম কর, যাহা কিছু দান কর, তপস্যা কর — তৎসমস্তই অর্পণ করিও আমাকে।
শুভাশুভফলৈরেবং মোক্ষ্যসে কর্মবন্ধনৈঃ।
সন্ন্যাসযোগযুক্তাত্মা বিমুক্তো মামুপৈষ্যসি।।২৮
অনুবাদ
আমাতে এইরূপ সর্বকর্ম সমর্পণ করিলে শুভাশুভ কর্মবন্ধন হইতে মুক্ত হইবে। আমাতে সর্বকর্মসমর্পণরূপ যোগে যুক্ত হইয়া কর্মবন্ধন হইতে মুক্ত হইয়া আমাকেই প্রাপ্ত হইবে।
সমোহহং সর্বভূতেষু ন মে দ্বেষ্যোহস্তি ন প্রিয়ঃ।
যে ভজন্তি তু মাং ভক্ত্যা ময়ি তে তেষু চাপ্যহম্।।২৯
অনুবাদ
সর্বভূতের পক্ষেই আমি সমান — দ্বেষ্যও নাই, প্রিয়ও নাই আমার। কিন্তু যাঁহারা ভক্তিপূর্বক আমার ভজনা করেন — আমাতে তাঁহারা অবস্থান করেন এবং সেই সকল ভক্তেই অবস্থান করি আমি।
অপি চেৎ সুদুরাচারো ভজতে মামনন্যভাক্।
সাধুরেব স মন্তব্যঃ সম্যগ্ব্যবসিতো হি সঃ।।৩০
অনুবাদ
অনন্যচিত্ত হইয়া অতি দুরাচার ব্যক্তিও যদি আমার ভজনা করে — সাধু বলিয়া তাহাকে মনে করিবে। কারণ তাঁহার অধ্যবসায় উত্তম।
ক্ষিপ্রং ভবতি ধর্মাত্মা শশ্বচ্ছান্তিং নিগচ্ছতি।
কৌন্তেয় প্রতিজানীহি ন মে ভক্তঃ প্রণশ্যতি।।৩১
অনুবাদ
ঈদৃশ দুরাচার ব্যক্তি শীঘ্র ধর্মাত্মা হয় এবং লাভ করে নিত্য শান্তি। হে কৌন্তেয়, তুমি সর্বসমক্ষে নিশ্চিত প্রতিজ্ঞা করিয়া বলিতে পার যে আমার ভক্ত কখনই বিনষ্ট হয় না।
মাং হি পার্থ ব্যপাশ্রিত্য যেহপি স্যুঃ পাপযোনয়ঃ।
স্ত্রিয়ো বৈশ্যাস্তথা শূদ্রাস্তেহপি যান্তি পরাং গতিম্।।৩২
অনুবাদ
হে পার্থ, স্ত্রীলোক, বৈশ্য ও শূদ্র অথবা যাঁহারা পাপযোনিসম্ভূত — তাঁহারাও আমার আশ্রয় লইলে নিশ্চয়ই পরমগতি প্রাপ্ত হন।
কিং পুনর্ব্রাহ্মণাঃ পুণ্যা ভক্তা রাজর্ষয়স্তথা।
অনিত্যমসুখং লোকমিমং প্রাপ্য ভজস্ব মাম্।।৩৩
অনুবাদ
যে পরমগতি পুণ্যশীল ব্রাহ্মণ ও রাজর্ষিগণ লাভ করিবেন তাহাতে আর কথা কি আছে? অতএব তুমি আমার আরাধনা কর। কারণ এই মর্ত্যলোক অনিত্য এবং সুখশূন্য।
মন্মনা ভব মদ্ভক্তো মদ্যাজী মাং নমস্কুরু।
মামেবৈষ্যসি যুক্ত্বৈবমাত্মানং মৎপরায়ণঃ।।৩৪
অনুবাদ
মনকে আমার চিন্তায় নিযুক্ত কর সর্বদা, ভক্তিমান্ হও আমাতে, পূজা কর আমার, আমাকেই নমস্কার কর। এইরূপে মৎপরায়ণ হইয়া আমাতে মন সমাহিত করিতে পারিলে আমাকেই প্রাপ্ত হইবে।
ইতি রাজবিদ্যারাজগুহ্যযোগ নামক
নবম অধ্যায় সমাপ্ত।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতোপনিষৎসু ব্রহ্মবিদ্যায়াং
যোগশাস্ত্রে শ্রীকৃষ্ণার্জুনসংবাদে
রাজবিদ্যারাজগুহ্যযোগো নাম নবমোহধ্যায়ঃ