গীতাসার

অধ্যায়সমূহ

॥ শাস্ত্র ॥

।। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ।।

গীতার সারসংক্ষেপ

কুরুক্ষেত্র মহাসমরে ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখনিঃসৃত অমৃতবাণীর বাংলা সারাংশ

পড়ুন ১৮টি অধ্যায় · সম্পূর্ণ সারাংশ

প্রস্তাবনা

কুরুক্ষেত্র মহাসমরের পূর্ব সময়ে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসদেব হস্তিনাপুরে আসিয়া জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্রের সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। উভয়ের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হইবার পর ধৃতরাষ্ট্র দুঃখপ্রকাশ করিয়া ব্যাসদেবকে বলিলেন—আমি দৃষ্টিহীন হইয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছি। এই কুরুক্ষেত্র মহাসমরের কোনো কিছুই নিজ চক্ষে দেখিতে পাইব না।

ধৃতরাষ্ট্রের নিকট এইরূপ মর্মান্তিক কথা শ্রবণ করিয়া ব্যাসদেব বলিলেন—এই মহাসমরের যাহা কিছু ঘটনাবলী, জ্ঞানী সঞ্জয়ের নিকট সমূহ বিষয় জানিতে পারিবেন। আমি জ্ঞানী সঞ্জয়কে দিব্যদৃষ্টি প্রদান করিতেছি। সঞ্জয় গৃহে থাকিয়া যুদ্ধের সমূহ ঘটনা দিব্যচক্ষে দর্শন করিয়া তোমাকে জানাইতে পারিব।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণের মুখনিঃসৃত বাণীই 'শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা'। কুরুক্ষেত্রের মহাসমরে উপস্থিত নিজ আত্মীয়-স্বজনগণকে বিপক্ষ দলে দর্শন করিয়া অর্জুন যুদ্ধ করিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করিলে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যে উপদেশ প্রদান করিয়াছিলেন, তাহার নাম 'গীতা'

অধ্যায়সমূহ

কুরুক্ষেত্র রণাঙ্গনে প্রবেশ করিয়া অর্জুন আত্মীয়-স্বজনগণকে যুদ্ধার্থে প্রস্তুত দেখিয়া, ধনুর্বাণ ত্যাগ করিয়া শ্রীকৃষ্ণকে বলিলেন—হে কৃষ্ণ!

আত্মীয়গণকে এই যুদ্ধে আগত দেখিয়া আমার শরীর অবসন্ন হইতেছে, এই আত্মীয়গণকে বধ করিয়া জয়লাভ করিতে চাহি না। কারণ কুলক্ষয় করা মহাপাপ। এই যুদ্ধজয়ে সুখ কোথায়?

হে মাধব! এই যুদ্ধাভিলাষী স্বজনগণকে দর্শন করিয়া আমার সর্বাঙ্গ কম্পিত হইতেছে। আমার হস্ত হইতে গাণ্ডিব খসিয়া পড়িতেছে, মুখ শুষ্ক হইতেছে। আমার মনে হইতেছে, মহাপাপের পথে আমি যেন অগ্রসর হইতেছি।

অতএব, হে মধুসূদন! আমি করজোড়ে আপনাকে প্রার্থনা করিতেছি, আমাকে এই পাপকার্যে নিয়োজিত করিবেন না।

অর্জুনকে বিষাদগ্রস্ত দেখিয়া ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন—হে অর্জুন! তুমি বীরশ্রেষ্ঠ, তোমার এইরূপ কাতরতা শোভা পায় না। মনের সমস্ত দুর্বলতা ত্যাগ করিয়া তুমি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও। ক্ষত্রিয়ের যুদ্ধ করাই শ্রেষ্ঠ ধর্ম, সেই ধর্ম ত্যাগ করিও না।

শ্রীকৃষ্ণের নিকট এই কথা শ্রবণ করিয়া অর্জুন বলিলেন—হে মাধব! এই যুদ্ধে উভয় পক্ষের যোদ্ধাই নিহত হইবে। বিশেষতঃ আমার পূজনীয় পিতামহ ভীষ্ম এবং অস্ত্রশিক্ষক দ্রোণাচার্যের উপর কেমন করিয়া অস্ত্রাঘাত করিব?

ইহাদের বধ করিলে মহাপাপে নিমজ্জিত হইব। কুলক্ষয়ে বর্ণসঙ্কর উৎপত্তি হইবে, সেই দোষে জলপিণ্ড লোপ হইয়া আমরা নরকে পতিত হইব।

অর্জুনকে এইরূপ বিষাদিত দেখিয়া ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সহাস্য বদনে বলিলেন—মৃত্যু কাহাকে বলে? মানবের বাল্য, কৈশোর, যৌবনের মতো মৃত্যুও একটি পর্যায়। আত্মার মৃত্যু নাই। আত্মার ক্ষয় নাই, ব্যয় নাই, আত্মা অবিনাশী।

মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র ত্যাগ করিয়া নূতন বস্ত্র পরিধান করে, আত্মাও তেমন জীর্ণ দেহ ত্যাগ করিয়া নূতন দেহ ধারণ করে।

কর্মই ধর্ম, কর্ম সকলকেই করিতে হয়। ব্রহ্মজ্ঞানীরাও কর্ম করেন, তবে তাঁদের কর্ম নিষ্কাম। তুমিও নিষ্কামভাবে যুদ্ধ করিয়া ক্ষত্রিয়ের ধর্মপালন করো।

অর্জুন বিভ্রান্ত হইয়াছেন—একটি ব্রহ্মজ্ঞান ও অন্যটি নিষ্কাম কর্ম। ইহার কোনটি অবলম্বন করা উচিত?

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন—হে অর্জুন! আমি মানুষের কল্যাণের জন্য বেদের ধর্ম প্রচার করিয়াছি। এই ধর্মে দুইটি পথের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে—একটি জ্ঞান, অপরটি নিষ্কাম কর্মের পথ।

আজীবন যাঁহারা ব্রহ্মচর্যে ব্রতী হইয়াছেন, তাঁহারাই জ্ঞানপথের অধিকারী। জ্ঞানপথে সিদ্ধিলাভ করা সাধারণের পক্ষে সম্ভব নহে। সেইজন্য সাধারণ গৃহীদের নিষ্কাম কর্ম করাই উচিত। নিষ্কাম কর্মের দ্বারা মন পবিত্র হয়। মন পবিত্র হইলে জ্ঞানও সঙ্গে সঙ্গে বিশুদ্ধ হইয়া যায়।

ষড়রিপুর মধ্যে প্রধান রিপু হইল কাম। কাম বাধাপ্রাপ্ত হইলে ক্রোধ প্রকাশ পায়। এই কাম মানবের চিরশত্রু।

রজোগুণ হইতে কাম জন্ম লইয়া ইন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধিকে আচ্ছন্ন করিয়া থাকে। সর্বপ্রথমে তুমি ইন্দ্রিয় জয় করিয়া কাম রিপুকে দমন করো। বুদ্ধির দ্বারা মনকে স্থির করিয়া জ্ঞান-বিজ্ঞান নাশকারী এই কামকে তুমি বিনাশ করো।

বহু প্রকার উপদেশ দেওয়া সত্ত্বেও অর্জুনের মনের সন্দেহ দূরীভূত না হওয়ায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন—হে অর্জুন! এই যোগের বিষয় পূর্বে আমি সূর্যকে বলিয়াছিলাম, সূর্য তাঁহার পুত্র মনুকে বলেন, মনু বলেন ইক্ষাকুকে। এইরূপ পরম্পরাপ্রাপ্ত এই যোগ রাজর্ষিগণ জানিতে পারিয়াছিলেন। কিন্তু সেই যোগ কালক্রমে নষ্ট হইয়া গিয়াছে।

অর্জুন এই কথা শুনিয়া বলিলেন—আপনার জন্ম পরে, সূর্যের জন্ম বহু পূর্বে। এই যোগ সম্বন্ধে আপনি যে পূর্বে সূর্যকে বলিয়াছিলেন, ইহা কি প্রকারে বুঝিব?

ভগবান বলিলেন—আমার এবং তোমার বহুবার জন্ম বিগত হইয়াছে। তুমি তাহা বিস্মরণ হইলেও তৎসমুদয় আমার স্মরণে আছে। আমি জন্ম-মৃত্যুহীন ও শাশ্বত। আমি সৃষ্টির আদি এবং এক হইয়াও বহু।

পৃথিবীতে যখন ধর্মের পতন এবং অধর্মের প্রাবল্য হয়, তখন এই ধরাধামে অবতীর্ণ হইয়া সাধুগণের পরিত্রাণ ও দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ করি।

জ্বলন্ত অগ্নি যেমন সমস্ত কাষ্ঠরাশি দগ্ধ করিতে পারে, সেইরকম সমস্ত প্রকার পাপ-পুণ্য রাশিকে জ্ঞানরূপ অগ্নি ভস্মসাৎ করিয়া দিতে পারে। যাঁহার গুরুর উপদেশ ও শাস্ত্রবাক্যে বিশ্বাস জন্মিয়াছে, তিনিই ইন্দ্রিয় দমন করিয়া জ্ঞানের অধিকারী হইতে পারেন।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে অর্জুন জিজ্ঞাসা করিলেন—হে কৃষ্ণ! আমাকে কর্ম ত্যাগ করিতে বলিয়া পুনরায় কর্মযোগকেই শ্রেষ্ঠ বলিতেছ। তুমি নিশ্চয় করিয়া বলো, ইহাদের মধ্যে কোনটি শ্রেষ্ঠ?

শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন—যোগ-সাধনা করিয়া যাঁহারা ব্রহ্ম-সনাতনকে জানিতে পারিয়াছেন, সমস্ত কর্ম তাঁহারাই শ্রীভগবানের চরণে অর্পণ করেন। জ্ঞানপথে গমন করিয়া জ্ঞানীগণ যে স্থানে উপস্থিত হইতে পারেন, সেই পরম স্থানে কর্মপথে কর্মযোগীগণও উপনীত হন।

যেমন পদ্মপত্র বারিমধ্যে জন্মিয়াও ঐ বারি পদ্মপত্রে স্পর্শ করে না, তদ্রূপ মন মধ্যে কামনা ত্যাগ করিয়া শ্রীভগবানে কামনা অর্পণ করেন। কোনো পাপে তিনি লিপ্ত হন না।

আমার মতে কর্মযোগই শ্রেষ্ঠ যোগ।

ষষ্ঠ অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলিলেন—কর্মফলের আশা ত্যাগ করিয়া যিনি অবশ্য কর্তব্য করেন, তিনিই সন্ন্যাসী ও যোগী। সুখে-দুঃখে তাঁহারা বিচলিত হন না। শত্রু-মিত্র, মান-অপমান ও শীত-গ্রীষ্ম সকল কিছুই তাঁহাদের নিকট সমান।

দেহ ও মন স্থির করিয়া চিত্ত সংযম করতঃ নিশ্চলভাবে বসিয়া শ্রীভগবানের উদ্দেশে যোগাভ্যাস করিতে হয়। এই চঞ্চল মনকে বৈরাগ্য ও অভ্যাসের দ্বারা বশ করিতে হইবে।

আত্মাকে নিম্নগামী করিতে নাই। আত্মাই আত্মার শত্রু, আত্মাই আত্মার মিত্র।

অর্জুন জিজ্ঞাসা করিলেন—কোনো কারণে সিদ্ধিলাভ না করিয়া যদি কেহ যোগভ্রষ্ট হন, তাঁহার গতি কিরূপ হয়? উত্তরে শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন—শুভকর্মের ফল অবশ্যই প্রাপ্ত হইবে, শুভ কর্ম কখনও বিফল হয় না। পরজন্মে সেই ব্যক্তি কোনো যোগীর গৃহে অথবা সচ্চরিত্র ধনীর গৃহে জন্মগ্রহণ করিয়া যোগপথে নিজেকে চালিত করেন।

শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন—আমার আশ্রয় গ্রহণ করিয়া যোগাভ্যাস করিলে যোগী আমাকে পাইতে পারেন। আমার সান্নিধ্য লাভের জন্যই মানবের এই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ। সহস্র সহস্র মানবের মধ্যে কোনো একজন হয়তো যত্নশীল হইয়া আমাকে জানিতে পারেন।

আমার দুইটি প্রকৃতি রহিয়াছে—অপরা প্রকৃতি ও পরা প্রকৃতি। অপরা প্রকৃতি অষ্টভাগে বিভক্ত—পৃথিবী, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ, মন, বুদ্ধি ও অহঙ্কার। অপর প্রকৃতিটি জীবরূপ পরা প্রকৃতি।

আমিই জলের রস, বেদের ওঁকার, আকাশের শব্দ, মনুষ্যের উদ্যম, পৃথিবীর পবিত্র সুগন্ধ, তপস্বীর তপস্যা, বুদ্ধিমানের বুদ্ধি, অগ্নির তেজ, চন্দ্র ও সূর্যের আলো এবং আমিই সর্বজীবের প্রাণ।

অর্জুন জিজ্ঞাসা করিলেন—ব্রহ্ম কিরূপ? অধ্যাত্ম কি? কর্মই বা কেমন? অধিভূত, অধিদৈব ও অধিযজ্ঞ কাহাকে বলে? কিরূপে সংযতচিত্ত ব্যক্তিগণ অন্তকালে তোমাকে জানিতে পারেন?

শ্রীভগবান বলিলেন—যিনি পরম অক্ষর অর্থাৎ যাঁহার ক্ষয় নাই, তিনিই ব্রহ্ম। যেই যেই ভাব চিন্তা করিয়া জীব দেহত্যাগ করেন তিনি সেই ভাবই প্রাপ্ত হন। যিনি মৃত্যুকালে আমাকে স্মরণ করিয়া দেহত্যাগ করেন, তিনি আমাকেই পাইয়া থাকেন।

অতএব, সর্বদা আমাকে স্মরণ করিয়া ক্ষাত্রধর্ম-পালনহেতু যুদ্ধ করো। অভ্যাসযোগে যুক্ত হইয়া অনন্যগামী চিত্তে জ্যোতির্ময় পুরুষ শ্রীভগবানের ধ্যান করিতে করিতে যোগী তাঁহাকেই প্রাপ্ত হন।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন—সমস্ত যোগের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হইল 'রাজযোগ'। যাহা শ্রেষ্ঠ বিদ্যা, যাহা শ্রেষ্ঠ জ্ঞান, যাহা অবগত হইতে পারিলে সংসারবন্ধন হইতে মানবের মুক্তি হয়—তাহাই রাজযোগ।

ঘোর পাপীও যদি ভক্তিভাবে আমার উপাসনা করে, তাহা হইলে তাহার সমস্ত পাপ বিনষ্ট করিয়া তাহাকে পুণ্যাত্মা করি। আমার ভক্তের বিনাশ নাই।

দেবতার পূজা করিলে দেবলোকে যান, পিতৃগণের পূজা করিলে পিতৃলোকে যান, আমার ভজনা করিলে ভক্তগণ আমাকেই পাইয়া থাকেন। যিনি ভক্তিপূর্ণ চিত্তে পত্র-পুষ্প ও ফল-জল আমাকে অর্পণ করেন, আমি আদরের সহিত সেই দানসকল গ্রহণ করি।

তুমি যজ্ঞ, দান, তপস্যা যাহা কিছু করিবে, তাহা আমাকে অর্পণ করিবে। তাহা হইলে এই সংসার-বন্ধন হইতে তোমাকে মুক্ত করিব।

শ্রীভগবান বলিলেন—দেবগণ ও মহর্ষিগণ আমার নানাবিধ বিভূতিতে আবির্ভাব জ্ঞাত নহেন, কারণ দেবগণ ও মহর্ষিগণের সর্বপ্রকারে আমি আদি কারণ।

আমি বেদশাস্ত্রের মধ্যে সামবেদ, দেবগণের মধ্যে ইন্দ্র, আদিত্যগণের মধ্যে বিষ্ণু, জ্যোতিষ্কের মধ্যে সূর্য, নক্ষত্রের মধ্যে চন্দ্র, ইন্দ্রিয়গণের মধ্যে মন, পুরোহিতগণের মধ্যে বৃহস্পতি, যদুকুলের মধ্যে কৃষ্ণ, পাণ্ডবদিগের মধ্যে অর্জুন, মুনিগণের মধ্যে ব্যাসদেব, কবিদিগের মধ্যে শুক্রাচার্য।

যাহা যাহা প্রধান, তাহা আমি। সকল বস্তুর মূল কারণ আমি। এই চরাচরে এমন কিছু নাই, আমা হইতে যাহা ভিন্ন। আমার দিব্য বিভূতির অন্ত নাই।

অর্জুন বলিলেন—হে কৃষ্ণ! তোমার অলৌকিক রূপ আমি দেখিতে ইচ্ছা করি। আমাকে সেইরূপ দেখিবার উপযুক্ত বলিয়া যদি তুমি বিবেচনা করো, তাহা হইলে সেই বিশ্বরূপ আমাকে দর্শন করাও।

শ্রীকৃষ্ণের অনুগ্রহে দিব্যচক্ষু লাভ করিয়া অর্জুন দেখিলেন যে, তাঁহার সম্মুখে বিরাট জগৎ-সংসার বিলীন হইয়া তাহার পরিবর্তে শত শত সূর্যের তেজ সমগ্র মহাশূন্যকে ব্যাপিয়া বহু হস্ত, পদ, বদন ও চক্ষু সমন্বিত এক বিরাট পুরুষ দণ্ডায়মান।

ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, দুর্যোধনাদি ও উভয় পক্ষের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধাগণ দ্রুতবেগে সকলে সেই ভয়ঙ্কর মূর্তির মুখগহ্বরে প্রবেশ করিতেছেন। লেলিহান অগ্নিশিখা যেন মুখগহ্বর হইতে বহির্গত হইতেছে।

অর্জুন ভীত হইয়া করজোড়ে প্রণাম করিয়া বলিলেন—তোমার মহিমা না জানিয়া বন্ধুজ্ঞানে, সখাজ্ঞানে পরিহাসছলে যে অপরাধ করিয়াছি, তজ্জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি।

শ্রীভগবান বলিলেন—তুমি আমার যে রূপ দর্শন করিলে, এইরূপ বেদাধ্যয়ন, যজ্ঞ, দান, তপস্যার দ্বারা দেখিতে পাওয়া যায় না। কেবলমাত্র অনন্যভক্তির দ্বারাই আমাকে জানিতে ও দর্শন করিতে পারা যায়।

বিশ্বরূপ দর্শন করিয়া অর্জুন শ্রীকৃষ্ণকে বলিলেন—জ্ঞানযোগ ও ভক্তিযোগের মধ্যে কোন্ পথ শ্রেষ্ঠ, তাহা বলুন।

শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন—যাঁহারা জ্ঞানপথে জিতেন্দ্রিয়া হইয়া অদ্বিতীয় ব্রহ্মের উপাসনা করেন, তাঁহারা আমাকে পাইয়া থাকেন। এই জ্ঞানপথ অত্যন্ত কঠোর। সাধারণের নিকট দুর্বোধ্য।

যাঁহারা ভক্তিপূর্ণ চিত্তে সমস্ত কর্মফল আমাকে অর্পণ করিয়া আমারই আরাধনা করেন, শ্রেষ্ঠ পথের পথিক তাঁহারাই।

কোনো জীবের প্রতি যিনি হিংসা করেন না, সকলকে ভালোবাসা দিয়া থাকেন, সর্ব অবস্থায় অর্থাৎ সুখে-দুঃখে যিনি সন্তুষ্ট চিত্ত, সেই ভক্ত আমার অতীব প্রিয়।

অর্জুন বলিলেন—হে কেশব! আমি প্রকৃতি ও পুরুষ, ক্ষেত্র ও ক্ষেত্রজ্ঞ, জ্ঞান ও জ্ঞেয় এই সকলের তত্ত্ব জানিতে ইচ্ছা করি।

শ্রীভগবান বলিলেন—শ্রীভগবান পুরুষ, তাঁহার শক্তিই প্রকৃতি। প্রকৃতি ত্রিগুণময়ী—সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ। পুরুষ ও প্রকৃতি উভয়কেই অনাদি বলিয়া জানিবে।

এই ভোগায়তন শরীরের নামই ক্ষেত্র। এই শরীরের যিনি তত্ত্ব জানেন, তাঁহাকেই ক্ষেত্রজ্ঞ বলিয়া জানিবে।

অহিংসা, নিরহঙ্কার, অনাসক্তি, ক্ষমা, অধ্যাত্মজ্ঞান, সমদর্শিতা—এইগুলি হইল জ্ঞান। জ্ঞেয়বস্তু একমাত্র পরমব্রহ্ম।

শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন—আমিই জগতের বীজপ্রদ পিতা, আমার শক্তিস্বরূপা প্রকৃতিই তাহাদের জননী। সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ—এই তিন গুণের রজ্জুদ্বারা প্রকৃতিরূপা মহামায়া জীবকুলকে বন্ধন করিয়া রাখিয়াছেন।

সত্ত্বগুণ

শান্তভাব, নির্মলতা, আনন্দ ও জ্ঞান — আনন্দলোকে মানবকে টানিয়া লইয়া যায়

রজোগুণ

লোভ-লালসা, কামনা-বাসনা — কর্মের পথে মানবকে টানিয়া লইয়া যায়

তমোগুণ

নিদ্রা, আলস্য, ভ্রান্তি, অজ্ঞানতা — অজ্ঞানপথে মানবকে টানিয়া লইয়া যায়

এই গুণত্রয়কে অতিক্রম করিতে পারিলে সিদ্ধিলাভ হয়।

ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন—পুরুষ ও প্রকৃতির নিত্যলীলায় আমি পুরুষোত্তম। এই সংসারকে জ্ঞানীগণ অশ্বত্থবৃক্ষ বলিয়া জানেন। ইহার মূল ঊর্ধ্বে, শাখা-প্রশাখা নিম্নদিকে। সংসাররূপ অশ্বত্থ-বৃক্ষের মূল হইলেন পুরুষোত্তম।

সংসার-বৃক্ষের ঐ সকল শাখা সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ তিনটিগুণের রসে পল্লবসকলকে শ্যামল করিয়া থাকে। বেদ ইহার পত্র। সংসার-বৃক্ষের ধ্বংস নাই, ইহা প্রবাহক্রমে নিত্য।

সংসারের ক্ষর ও অক্ষর নামে দুইরকম পুরুষ বর্তমান। সংসারের জীবসকল ক্ষর অর্থাৎ বিনাশশীল পুরুষ, অবিনাশী আত্মাই অক্ষর পুরুষ। ক্ষর ও অক্ষর হইতেও যিনি উত্তম পুরুষ আছেন, তিনিই পরমাত্মা।

শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন—সংসারে দুই প্রকৃতির মানুষ বর্তমান। একপ্রকার মানুষ দেবপ্রকৃতি সম্পন্ন, আর একপ্রকার অসুর প্রকৃতির। পূর্বজন্মের সুকৃতি ও দুষ্কৃতির ফল অনুসারে দেব ও অসুর প্রকৃতিসম্পন্ন হইয়া মানুষ জন্মগ্রহণ করে।

দেবপ্রকৃতি

নির্ভীক, যজ্ঞ-দান-তপস্যায় আনন্দ, ত্যাগ, দয়া, ক্ষমা, ক্রোধশূন্য, সত্যপরায়ণ — মুক্তিলাভ করেন

অসুরপ্রকৃতি

অভিমান, ক্রোধ, দাম্ভিকতা, অনাচার, ভক্তিহীনতা, অশ্রদ্ধা, ইন্দ্রিয়াসক্তি ও লোভ — নীচযোনিপ্রাপ্ত হইয়া থাকে

অর্জুন জিজ্ঞাসা করিলেন—হে কৃষ্ণ! যাহারা শাস্ত্রবিধি পরিত্যাগ করিয়া শ্রদ্ধাসহকারে দেবাদির অর্চনা করে, তাহাদের নিষ্ঠা কিরূপ?

শ্রীভগবান বলিলেন—দেহীদিগের শ্রদ্ধা সাত্ত্বিকী, রাজসী ও তামসী ভেদে ত্রিবিধ। গুণের তারতম্য অনুসারে যাঁহার যে শ্রদ্ধা যত প্রাবল্য লাভ করিয়াছে, তিনি তাদৃশ ভাবাপন্ন হইয়া থাকেন।

সাত্ত্বিক ভাবাপন্ন ব্যক্তি দেবতার পূজা করেন, রাজসিক ব্যক্তি যক্ষ-রাক্ষসের পূজা করেন, তামসিক ব্যক্তি ভূত-পিশাচের পূজা করে।

কাহারও শ্রদ্ধা ব্যতীত কল্যাণ ও জ্ঞানলাভ হয় না। শ্রদ্ধায় জ্ঞানলাভ হয়, জ্ঞান হইলে মুক্তিলাভ হয়।

অশ্রদ্ধায় দান, হোম ও তপস্যা যাহা কিছু করা হউক না কেন, তাঁহা অসৎ। ঐ অসৎ কর্ম কি পরলোকে, কি ইহলোকে—কোনো লোকেই ফলদায়ক হয় না।

শ্রীভগবান বলিলেন—কর্মফলের আসক্তি ত্যাগ করাই প্রকৃত সন্ন্যাস বা ত্যাগ। যাঁহারা সংসারের কাজকর্ম পরিত্যাগকেই সন্ন্যাস বলিয়া ভাবেন, তাঁহারা ভুল করিয়া থাকেন। ফলের আশা না করিয়া কর্তব্যকর্ম করাই ধর্ম।

ব্রাহ্মণের কর্ম—বেদাধ্যয়ন, পূজা ও শাস্ত্রপাঠ। ক্ষত্রিয়ের কর্ম—যুদ্ধ ও প্রজাপালন। বৈশ্যের কর্ম—কৃষিকর্ম ও ব্যবসা-বাণিজ্য। শূদ্রের কর্ম—উক্ত তিন বর্ণের সেবা। স্বধর্ম ত্যাগ করিয়া পরধর্ম গ্রহণ করিবে না।

হে অর্জুন! সর্বধর্ম পরিত্যাগপূর্বক
একমাত্র আমারই শরণাপন্ন হও,
আমি তোমাকে সমুদয় পাপ হইতে মুক্ত করিব।

শ্রীভগবানের মধুময় বাক্য শ্রবণ করিয়া অর্জুন বলিলেন—তোমার মুখনিঃসৃত শাস্ত্রবাক্য শ্রবণ করিয়া আমার সকল প্রকার মোহ দূরীভূত হইয়াছে। এক্ষণে আমি সংশয়শূন্য। জয়-পরাজয়ের চিন্তা পরিত্যাগ করিয়া আমি গাণ্ডিব ধারণ করিলাম।

সঞ্জয়ের উক্তি

সঞ্জয় ধৃতরাষ্ট্রকে বলিলেন—হে মহারাজ! ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের রোমাঞ্চকর কথোপকথন আপনার নিকট ব্যক্ত করিলাম। মহামুনি ব্যাসদেবের কৃপায় পরম গুহ্যযোগ শ্রীকৃষ্ণের মুখে সাক্ষাৎ শ্রবণ করিয়াছি।

শ্রীকৃষ্ণের অদ্ভুত বিশ্বরূপ যতই আমি স্মরণ করিতেছি, ততই বিস্ময়ে ও আনন্দে অভিভূত হইতেছি।

সেইস্থানে যোগেশ্বর শ্রীকৃষ্ণ এবং গাণ্ডিবধারী অর্জুন অবস্থিত আছেন, সেইস্থানে বিজয়, লক্ষ্মী, অভ্যুদয় ও অচঞ্চলা নীতি বর্তমান—ইহাই আমার স্থির বিশ্বাস।