১
অর্জুনবিষাদযোগ
Arjuna Vishada Yoga
শ্লোক ৪৬
কুরুক্ষেত্র রণাঙ্গনে প্রবেশ করিয়া অর্জুন আত্মীয়-স্বজনগণকে যুদ্ধার্থে প্রস্তুত দেখিয়া ধনুর্বাণ ত্যাগ করিয়া শ্রীকৃষ্ণকে বলিলেন — "এই আত্মীয়গণকে বধ করিয়া জয়লাভ করিতে চাহি না। কুলক্ষয় করা মহাপাপ। আমার হস্ত হইতে গাণ্ডিব খসিয়া পড়িতেছে, সর্বাঙ্গ কম্পিত হইতেছে। হে মধুসূদন, আমাকে এই পাপকার্যে নিয়োজিত করিবেন না।"
২
সাংখ্যযোগ
Sankhya Yoga
শ্লোক ৭২
শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন — "আত্মার মৃত্যু নাই, আত্মা অবিনাশী। মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র ত্যাগ করিয়া নূতন বস্ত্র পরিধান করে, আত্মাও তেমন জীর্ণ দেহ ত্যাগ করিয়া নূতন দেহ ধারণ করে। কর্মই ধর্ম। তুমি নিষ্কামভাবে যুদ্ধ করিয়া ক্ষত্রিয়ের ধর্মপালন করো।"
৩
কর্মযোগ
Karma Yoga
শ্লোক ৪৩
শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন — "গৃহীদের নিষ্কাম কর্ম করাই উচিত। যে কার্যে ব্রতী হইয়াছেন তাহা ভগবানেরই কার্য। কামবাধাপ্রাপ্ত হইলে ক্রোধ প্রকাশ পায় — ইহাই মানবের চিরশত্রু। বুদ্ধির দ্বারা মনকে স্থির করিয়া কামকে বিনাশ করো।"
৪
জ্ঞানযোগ
Jnana Yoga
শ্লোক ৪২
শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন — "পৃথিবীতে যখন ধর্মের পতন ও অধর্মের প্রাবল্য হয়, তখন ধরাধামে অবতীর্ণ হইয়া সাধুগণের পরিত্রাণ ও দুষ্কৃতকারীদের বিনাশ করি। জ্ঞানরূপ অগ্নি সমস্ত পাপ-পুণ্য ভস্মসাৎ করিতে পারে। সন্দেহ পরিত্যাগ করিয়া যুদ্ধের জন্য উত্থিত হও।"
৫
সন্ন্যাসযোগ
Sannyasa Yoga
শ্লোক ২৯
শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন — "জ্ঞানপথে জ্ঞানীগণ যে স্থানে উপস্থিত হন, কর্মপথে কর্মযোগীগণও সেই পরম স্থানে উপনীত হন। পদ্মপত্র বারিমধ্যে জন্মিয়াও জলে লিপ্ত হয় না — তদ্রূপ মনে কামনা ত্যাগ করিয়া ঈশ্বরে কামনা অর্পণ করিলে কোনো পাপে লিপ্ত হন না।"
৬
ধ্যানযোগ
Dhyana Yoga
শ্লোক ৪৭
শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন — "কর্মফলের আশা ত্যাগ করিয়া অবশ্য কর্তব্য করেন তিনিই সন্ন্যাসী ও যোগী। দেহ ও মন স্থির করিয়া শ্রীভগবানের উদ্দেশে যোগাভ্যাস করিতে হয়। চঞ্চল মনকে বৈরাগ্য ও অভ্যাসের দ্বারা বশ করিতে হইবে। তুমি যোগী হও।"
৭
জ্ঞানবিজ্ঞানযোগ
Jnana Vijnana Yoga
শ্লোক ৩০
শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন — "আমার দুইটি প্রকৃতি — অপরা ও পরা। পৃথিবী-জল-অগ্নি-বায়ু-আকাশ-মন-বুদ্ধি-অহঙ্কার এই অষ্টভাগ অপরা প্রকৃতি। জীবরূপ পরা প্রকৃতিই জগৎ ধারণ করিয়া রহিয়াছে। আমিই জলের রস, বেদের ওঁকার, পৃথিবীর সুগন্ধ, সর্বজীবের প্রাণ।"
৮
অক্ষরব্রহ্মযোগ
Akshara Brahma Yoga
শ্লোক ২৮
শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন — "যিনি পরম অক্ষর অর্থাৎ যাঁহার ক্ষয় নাই, তিনিই ব্রহ্ম। যে যেই ভাব চিন্তা করিয়া দেহত্যাগ করেন তিনি সেই ভাবই প্রাপ্ত হন। যিনি মৃত্যুকালে আমাকে স্মরণ করিয়া দেহত্যাগ করেন, তিনি আমাকেই পাইয়া থাকেন।"
৯
রাজবিদ্যারাজগুহ্যযোগ
Rajavidya Rajaguhya Yoga
শ্লোক ৩৪
শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন — "আমি অব্যক্তরূপে সমগ্র জগৎ ব্যাপিয়া আছি। ঘোর পাপীও যদি ভক্তিভাবে আমার উপাসনা করে তাহার পাপ বিনষ্ট করিয়া তাহাকে পুণ্যাত্মা করি। যিনি ভক্তিপূর্ণ চিত্তে পত্র-পুষ্প ও ফল-জল আমাকে অর্পণ করেন আমি সেই দান গ্রহণ করি।"
১০
বিভূতিযোগ
Vibhuti Yoga
শ্লোক ৪২
শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন — "সকল জীবের মধ্যে যে আত্মা, সেই আত্মাই আমি। আমি বেদের মধ্যে সামবেদ, দেবগণের মধ্যে ইন্দ্র, সূর্যের মধ্যে বিষ্ণু, নক্ষত্রের মধ্যে চন্দ্র, পাণ্ডবদিগের মধ্যে অর্জুন, মুনিগণের মধ্যে ব্যাসদেব। যাহা যাহা প্রধান, তাহা আমি।"
১১
বিশ্বরূপদর্শনযোগ
Vishwarupa Darshana Yoga
শ্লোক ৫৫
দিব্যচক্ষু লাভ করিয়া অর্জুন দেখিলেন শত শত সূর্যের তেজ সমগ্র মহাশূন্যকে ব্যাপিয়া বহু হস্ত-পদ-বদন-চক্ষু সমন্বিত এক বিরাট পুরুষ দণ্ডায়মান। অর্জুন ভীত হইয়া ক্ষমা প্রার্থনা করিলেন। শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন — "কেবলমাত্র অনন্যভক্তির দ্বারাই আমাকে জানিতে ও দর্শন করিতে পারা যায়।"
১২
ভক্তিযোগ
Bhakti Yoga
শ্লোক ২০
শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন — "জ্ঞানপথ অত্যন্ত কঠোর ও সাধারণের নিকট দুর্বোধ্য। যাঁহারা ভক্তিপূর্ণ চিত্তে সমস্ত কর্মফল আমাকে অর্পণ করিয়া আমারই আরাধনা করেন, শ্রেষ্ঠ পথের পথিক তাঁহারাই। কোনো জীবের প্রতি যিনি হিংসা করেন না, সকল অবস্থায় যিনি সন্তুষ্ট, সেই ভক্ত আমার অতীব প্রিয়।"
১৩
ক্ষেত্রক্ষেত্রজ্ঞবিভাগযোগ
Kshetra Kshetrajna Vibhaga Yoga
শ্লোক ৩৫
শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন — "এই ভোগায়তন শরীরের নামই ক্ষেত্র। এই শরীরের তত্ত্ব যিনি জানেন, তাঁহাকেই ক্ষেত্রজ্ঞ বলিয়া জানিবে। অহিংসা, নিরহঙ্কার, অনাসক্তি, ক্ষমা, অধ্যাত্মজ্ঞান, সমদর্শিতা — এইগুলি হইল জ্ঞান। জ্ঞেয়বস্তু একমাত্র পরমব্রহ্ম।"
১৪
গুণত্রয়বিভাগযোগ
Gunatraya Vibhaga Yoga
শ্লোক ২৭
শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন — "সত্ত্ব-রজঃ-তমঃ এই তিন গুণের রজ্জুদ্বারা প্রকৃতিরূপা মহামায়া জীবকুলকে বন্ধন করিয়া রাখিয়াছেন। শান্তভাব ও জ্ঞান সত্ত্বগুণের লক্ষণ। লোভ-লালসা রজঃগুণের লক্ষণ। নিদ্রা, আলস্য, অজ্ঞানতা তমোগুণের লক্ষণ। এই গুণত্রয়কে অতিক্রম করিতে পারিলে সিদ্ধিলাভ হয়।"
১৫
পুরুষোত্তমযোগ
Purushottama Yoga
শ্লোক ২০
শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন — "এই সংসারকে জ্ঞানীগণ অশ্বত্থবৃক্ষ বলিয়া জানেন — মূল ঊর্ধ্বে, শাখা নিম্নদিকে। কামনা-বাসনা যাঁহার সংযত, সুখে-দুঃখে অবিচলিত, তাঁহারাই মুক্তিলাভ করেন। ক্ষর ও অক্ষর হইতেও যিনি উত্তম পুরুষ আছেন, তিনিই পরমাত্মা পুরুষোত্তম।"
১৬
দৈবাসুরসম্পদ্বিভাগযোগ
Daivasura Sampadvibhaga Yoga
শ্লোক ২৪
শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন — "সংসারে দুই প্রকৃতির মানুষ — দেবপ্রকৃতি ও অসুরপ্রকৃতি। দেবপ্রকৃতির মানুষ নির্ভীক, যজ্ঞ-দান-তপস্যায় আনন্দিত, ক্ষমাশীল ও সত্যপরায়ণ। অভিমান-দাম্ভিকতা-ক্রোধ-লোভ অসুর প্রকৃতির। দেবপ্রকৃতির মানুষ মুক্তিলাভ করেন।"
১৭
শ্রদ্ধাত্রয়বিভাগযোগ
Shraddhatraya Vibhaga Yoga
শ্লোক ২৮
শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন — "দেহীদিগের শ্রদ্ধা সাত্ত্বিকী, রাজসী ও তামসী ভেদে ত্রিবিধ। কাহারও শ্রদ্ধা ব্যতীত কল্যাণ ও জ্ঞানলাভ হয় না। শ্রদ্ধায় জ্ঞানলাভ হয়, জ্ঞান হইলে মুক্তিলাভ হয়। অশ্রদ্ধায় দান-হোম-তপস্যা যাহাই করা হউক — তাহা অসৎ, ইহলোকে বা পরলোকে কোনো ফলদায়ক হয় না।"
১৮
মোক্ষযোগ
Moksha Yoga
শ্লোক ৭৮
শ্রীকৃষ্ণ বলিলেন — "কর্মফলের আসক্তি ত্যাগ করাই প্রকৃত সন্ন্যাস। ফলের আশা না করিয়া কর্তব্যকর্ম করাই ধর্ম। সর্বধর্ম পরিত্যাগপূর্বক একমাত্র আমারই শরণাপন্ন হও, আমি তোমাকে সমুদয় পাপ হইতে মুক্ত করিব।" অর্জুন বলিলেন — "আমার সকল মোহ দূরীভূত, আমি তোমার উপদেশ মতো কার্য করিব।"
🕉️
যত্র যোগেশ্বরঃ কৃষ্ণো যত্র পার্থো ধনুর্ধরঃ।
তত্র শ্রীর্বিজয়ো ভূতির্ধ্রুবা নীতির্মতির্মম।।
যে পক্ষে যোগেশ্বর কৃষ্ণ ও ধনুর্ধর পার্থ —
সেখানেই লক্ষ্মী, বিজয়, ঐশ্বর্য ও অচঞ্চলা নীতি।
ইতি গীতার তত্ত্বসার সমাপ্তম্।